সরকারের ভেতরে সরকার সুখরঞ্জন ও গুমসূত্র
আবদুল
আউয়াল ঠাকুর :সুখরঞ্জন বালির খোঁজ পাওয়া গেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কঠোর
নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে যিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন তাকে পাওয়া গেছে ভারতের
পশ্চিম বাংলার দমদম কারাগারে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে
মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বালি নিখোঁজ হয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক আদালত চত্বরে
আইনজীবীর গাড়ি থেকে। তার নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও
সরকারি মহল থেকে কোন উচ্চবাচ্য করা হয়নি। তখন থেকেই এটি রহস্যাবৃত্ত মনে
হয়েছিল। কারণ যিনি বা যারা সুখরঞ্জন বালির আদালত চত্বরে আসার খবর রেখেছেন
তারা তার হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কিছু জানেন না এমনটা মনে করার সঙ্গত কোন
কারণ ছিল না। রহস্যের হঠাৎ করেই উন্মোচন হয়েছে, নিউইয়র্ক ভিত্তিক
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বাংলাদেশের ইংরেজি
দৈনিক দ্যা নিউ এইজের মাধ্যমে। এইজের প্রতিবেদনে দমদম কারাগারে বালি আটক
রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। খবর পাওয়ার পর ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে কারাগারে
বালির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এইজের
কাছে দেয়া বিবৃতিতে বালি বলেছেন, গত বছরের ৫ নভেম্বর সকালে আন্তর্জাতিক
ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে অপহরণ করে একটি অফিসে
নিয়ে যায় এবং এরপর ৬ সপ্তাহ আটক রেখে ২৩ ডিসেম্বর সীমান্তে নিয়ে গিয়ে
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ তার সাথে দুব্যর্বহার
করে, মারধর করে এবং এরপর একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে
যাওয়া হয় স্বরূপনগর থানায়। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুখরঞ্জন বালি তার
ভাই পরিতোষ বালির সাথে সাক্ষাতের জন্য সীমান্ত পার হতে গিয়ে ধরা পড়েছেন।
অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি এখন কারাগারে
রয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের আলোচনায় শুধু সুখরঞ্জন বালি নয় বরং এমনতর
বহুজনের আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুখরঞ্জন বালির আলোচনা হয়তো আর
দশ জনের মতোই হারিয়ে যেতে পারতো। তবে ব্যতিক্রম এই যে, তিনি এমন এক মামলার
সাক্ষী যার সাক্ষ্যের ওপর আসামির দন্ডাদেশের অনেক কিছু নির্ভরশীল। এর আগেই
তিনি প্রকাশ্যত বলেছেন, তার ভাই বিষবালি হত্যাকান্ডের সাথে মাওলানা
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যুক্ত ছিলেন না। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং
দেইল্লা রাজাকার সম্পর্কিত যে আলোচনা সে ক্ষেত্রে বালির সাক্ষ্য
গুরুত্বপূর্ণ। বালি সরকারের সাথে একমত পোষণ না করার কারণে নানামুখী
নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। বারবারই বালি একথা বলেছেন, আমি মিথ্যা বলতে
পারবো না। যে দুটি মামলায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ
হয়েছে তার একটি বিষবালি হত্যা মামলা। সুতরাং একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী
হাওয়া হয়ে গেলো এবং তার কোন খোঁজ সরকারি পক্ষ থেকে নেয়া হলো না এটি
গ্রহণযোগ্য নয়। অন্তত সারাদেশে যারা ফাঁসির দাবিতে বাজার গরম করে রেখেছেন
তাদেরও কোন উচ্চবাচ্য না থাকায় বিষয়টির রহস্য নিয়ে প্রশ্ন না উঠার কোন
সুযোগ নেই। রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব ছিল তার সাক্ষীকে হাজির করা। অন্যদিকে
সাক্ষী এবং একজন নাগরিক কিভাবে হাওয়া হয়ে গেলো সে সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট
বক্তব্য পাওয়া না গেলে সামগ্রিকভাবেই জনগণের নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি গুরুতর
বিবেচনায় ওঠে আসে। প্রকাশ্যে অপহৃত তারপর হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটির
পাশাপাশি বালিকে ভারতে পাওয়ার আলোচনা খানিকটা নির্দেশক। বালিকে যেভাবে
হস্তান্তর করা হয়েছে অন্তত যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, বর্তমান আমলে একে
অবিশ্বাস্য মনে করার কোন কারণ নেই। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল, উলফা প্রধান
অরবিন্দ রাজখোয়ার ব্যাপারেও। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হস্তান্তরের কথা স্বীকার
করা না হলেও প্রভাবশালী ভারতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাজখোয়া নিজেই
স্বীকার করেন, ২০০৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে
ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে প্রকাশিত বিভিন্ন
খবরে বলা হয়েছে, এ ধরনের লোকদেরকে গ্রেফতার করার পরে সীমান্তের নির্দিষ্ট
স্থানে ছেড়ে দেয়া হয় এবং এর পরপরই ভারতীয় বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে যায়।
উলফার সামরিক শাখার উপপ্রধান রাজু বড়–য়া, পররাষ্ট্র শাখা প্রধান শশধর, অর্থ
শাখার প্রধান বিএন হাজারিকা, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক প্রণতি ডেকা ও তাদের
স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ পরিবার-পরিজনকেও একইভাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া
হয়েছে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্যা টেলিগ্রাফের খবরে
বলা হয়েছে, এক রাতেই উলফার অন্তত ২৮ জন নেতাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী
বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে,
তুলে দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের গোচরে নেই বলে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং প্রাসঙ্গিক নানাজনের খবর অনুযায়ী,
এটা বলা হয়, কেবলমাত্র আলোচ্যদেরই নয়, বরং এর বাইরেও বাংলাদেশে অবস্থানরত
অনেককেই বর্তমান সরকারের আমলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা
হয়েছে। এখানে ভারতীয়দের নিরাপত্তার যে মৌলিক বিষয়টি রয়েছে সে আলোচনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভারত সফরের সময়ও উঠে
এসেছে। ভারতীয়দের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে উদ্বিগ্নতার বিবেচনায় বাংলাদেশ
সরকারকে যে কাজে লাগাতে চায় সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভারতীয়দের সমর্থন
অসমর্থনের নানামাত্রিক সম্পর্ক যে রয়েছে এটা নতুন কিছু নয়। ভারত তো চীন নয়
যে, কেবলমাত্র পারস্পরিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক
রক্ষা করবে বরং ভারত হচ্ছে, কৌটল্যের নীতি এবং ম্যাকিয়াভেলীর তত্ত্বে
বিশ্বাসী। সুতরাং তার নিজের স্বার্থ সে দেখবে এতে অবাক হওয়ার কিছু না
থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কতটা আন্তরিক অথবা আন্তরিকতাকে
বিবেচ্য বলে মনে করছে কিনা সেটিই দেখার। নানাদিক থেকে প্রাসঙ্গিক আলোচনায়
রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের যে প্রসঙ্গ রয়েছে সে ক্ষেত্রেও একে এড়িয়ে যাবার কোন
সুযোগ নেই। সরকার কার্যত জাতীয় না, ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে সে বিতর্ক
কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। রাজনীতি বর্তমানে যে জটিল চক্রে রয়েছে
সেখানে জাতীয় স্বার্থের আলোচনা সর্বাগ্রে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতীয় স্বার্থ
রক্ষা এবং নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে একত্রে গ্রহণ করা সম্ভব কিনা
সে আলোচনায় হয়তো নানা প্রসঙ্গ উঠে আসতে পারে। তবে চীন যেভাবে পাকিস্তানের
বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তেমনিভাবে বাংলাদেশের পাশে ভারত দাঁড়াতে চাইলে
হয়তো আলোচনা ভিন্ন হতে পারতো। গভীর বিশ্লেষণে না গিয়েও বলা যায়, এ অঞ্চলে
ভারত, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল, মেক্সিকোর সাথে আমেরিকা এবং কিউবার সম্পর্ক
এরকম কিছু আলোচনা বাদ দিলে পৃথিবীর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমান্ত বিরোধকে কোন
গভীর বিবেচনায় নেয়া হয় না। সীমান্ত থাকলেও তাকে খুব কঠিনভাবে দেখার সুযোগ
থাকে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অনেক দেশই তাদের অংশভুক্ত দরিদ্র
দেশগুলোকে রক্ষার জন্য মুক্তহস্তে এগিয়ে আসছে। সুখরঞ্জন বালির আলোচনা
এক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিকতার সৃষ্টি করেছে। হয়তো নামের জন্যই বালি এখনও টিকে
আছে। নয়তো অন্যকিছু হতে পারতো। বিবিসি কেন সুখরঞ্জন বালির স্বপ্রণোদিত
সীমান্ত অতিক্রমণের অবৈধ চেষ্টার প্রসঙ্গটিকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে তা
পরিষ্কার নয়। তবে এটা বোঝা যায়, বালির সাথে ভারতীয়দের আচরণ রহস্যজনক।
বাংলাদেশের একজন সাধারণ হিন্দু নাগরিকের সীমান্ত অতিক্রমণ নিয়ে এতো কিছুর
কোন প্রয়োজন ছিল না। একজন কাঠমিস্ত্রীকে নির্যাতনের পর হাসপাতালে ভর্তি
করার মতো বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতেই বোঝা যায়, তাকে হস্তান্তরের
আগে এমন কিছু তথ্য ভারতীয়দের কাছে দেয়া হয়েছে যা ভারতীয় স্বার্থ বিরোধী।
হয়তো এসবের পূর্ণ বিবরণ পেতে আরো কিছু সময় নিবে। তবুও এটা মনে করার
যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে, বালি হয়তো মিস রিপোর্টিংয়ের শিকার হয়ে থাকতে
পারেন। ব্যাপারটি অনেকটা বাংলাদেশের মোবারকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের মোবারক মিস রিপোর্টিংয়ের জন্য পৃথিবীর জঘন্য কারাগার
গুয়ান্তনামাবেতে অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পাকিস্তান গিয়েছিলেন
ধর্ম বিদ্যা শিখতে। সেখান থেকে আগ্রাসী যৌথবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়
বিপজ্জনক সন্ত্রাসী হিসেবে। তার পরের ঘটনা বিশ্ববাসী জেনেছে। বাংলাদেশের
মোবারক কোন অপরাধী ছিলেন না। সেখানকার আদালতও সেটি বিবেচনায় নিয়েছে।
আদালতের কারণেই মোবারক বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরেছেন। দেখা যাচ্ছে, প্রায়শই
বাংলাদেশের কারাগারে এমনকিছু নাগরিককে পাওয়া যাচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে কোন
মামলা নেই। কিন্তু কারাবাস ভাগ্যে লেখা রয়েছে। কোন অপরাধের সম্পৃক্তারও কোন
দলিল নেই। তাহলে কেন তারা কারাগারে? বলার বা বোঝার অপেক্ষা রাখে না,
গণগ্রেফতার বলে যে বিশেষ টার্ম চালু রয়েছে তার শিকার হয়েই এসব নাগরিক
অনির্দিষ্টকাল কারাবাস করেন। যাদের কল্যাণে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিপুষ্ট
তাদের অনেকেই ভাগ্যান্বেষণে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন কারাগারে আটকা পড়ে রয়েছে।
তবে এসবের আলাদা আলাদা দিক রয়েছে। সুখরঞ্জন এদের অন্তর্ভুক্ত নন। তা
সত্ত্বেও ভারতীয় যে কারাগারে তিনি বন্দি রয়েছেন প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী,
ক’দিন আগেই বন্দি বাংলাদেশীদের দেখতে ওই কারাগারে বাংলাদেশের দায়িত্বশীলরা
গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখরঞ্জন বালি সেখানে আছেন কিনা সেটা নাকি শনাক্ত করা
সম্ভব হয়নি। রহস্যের জাল এখানেও। বোধহয় এটা বলা অন্যায় নয় যে, সংশ্লিষ্ট
কর্তারা হয়তো নিশ্চিত হতেই গিয়েছিলেন বালি আসলেই সেখানে আছে কিনা? কারণ
বালির হারিয়ে যাওয়া যতগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সেগুলোর সমাধান করা
অত্যন্ত জটিল। এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশী নাগরিক গুম হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তার
বিবরণ সকলের কাছে নেই। এ মাসেই আইন সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের চার বছরে ১৫৬ জন গুম হয়েছে। বলা হয়েছে, গুম
হওয়াদের মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেলেও অন্যদের কোন হদিস মেলেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ২০১২ সালের মানবাধিকার রিপোর্টেও বাংলাদেশের বড়
মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে জোরপূর্বক গুমের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী যেমন র্যাব ও ক্রিমিনাল
ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের মাধ্যমে গুম ও অপহরণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অধিকারের
তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ২৪টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল
৩০। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের
বার্ষিক রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে বিভীষিকাময় চিত্র তুলে
ধরা হয়েছে সরকার তা মানতে নারাজ। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী,
বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমসহ অনেককেই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ
রয়েছেন। এ মাসেই ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এক বছর কেটে
গেলেও প্রভাবশালী এই নেতার ভাগ্যে কী ঘটেছে তিনি জীবিত না মৃত সে প্রশ্নের
জবাব মেলেনি। দীর্ঘ সময়েও তার হদিস পায়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসেও স্বজনরা ফিরে পায়নি তাকে। তাকে উদ্ধারে
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কেবলমাত্র কোর্টের কাছে রুটিনমাফিক তদন্ত
রিপোর্ট জমা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত বছর মে মাসে একজন ব্রিটিশ
মন্ত্রীও বাংলাদেশ সরকারের কাছে ইলিয়াসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ
প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুরোধ
করেছিলেন। বিএনপির এই নেতাও প্রকাশ্য রাজপথ থেকে গুম হয়েছিলেন। তার গুম
হওয়ার ঘটনা যে পুলিশ কর্মকর্তা দেখেছিলো সেই মাহবুবের পরিণতিও নাকি একই
হয়েছে। অপহরণের সময় যেসব সাধারণ লোকজন দেখেছিল তাদের ভাগ্যেও নেমে এসেছে
নির্মমতা। অনুরূপভাবে প্রকাশ্য মিটিং থেকেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন চৌধুরী
আলমসহ আরো অনেকেই। আজ পর্যন্ত তাদের কোন খবর পাওয়া যায়নি। গুম হওয়া একজন
শ্রমিক নেতা ফিরে এসে যে বিবরণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি বলেছেন, তার ধারণা তাকে
যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে অনুরূপভাবে আরো অনেকে ছিল। নানা হাত ঘুরে
শেষপর্যন্ত পুলিশের গাড়িতেই তাকে নির্দিষ্ট থানায় পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। ওই
নেতাকে প্রকাশ্য রাজপথ থেকে গুম করে ফেলা হয়েছিল। আর গুম হওয়ার সাথে সাথেই
পরিবহন শ্রমিকরা রাজধানী অচল করে দিয়ে তার মুক্তি নিশ্চিত করার দাবি
করেছিল। শ্রমিক নেতার গুম থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুখরঞ্জন বালিকে খুঁজে
পাওয়ার ঘটনা থেকে প্রাসাঙ্গিক ধারণা গ্রহণ করা অমূলক নয়। গুম রহস্যের
সূত্র হয়তো এখন পুরোপুরি উৎঘাটন করা যায়নি। তবে কাছাকাছি হয়তো আসা গেছে।
এখনো পরিষ্কার হয়নি গুমের ঘটনার সাথে এক না একাধিক গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুম-অপহরণের ঘটনাকে অস্বীকার করছে আইন-শৃঙ্খলা
বাহিনী। প্রশ্ন উঠতে পারে, গুম যেহেতু বাস্তব তাহলে গুমের সাথে কারা জড়িত?
তারা কী রাষ্ট্রের নাকি অন্য কোন জায়গা থেকে আগত। এই প্রশ্ন আরো গুরুতর
আকারে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সরকারি কিছু সিদ্ধান্তের কারণে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভা-সমিতি বন্ধ করেছেন। সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা বলছেন,
এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে হয়নি। বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে সরকারি
জোটের একজন নেতা বলেছেন, আপাও জানেন না। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেছেন, কার্যত সরকারের মধ্যেই সরকার রয়েছে।
তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উপদেষ্টা-মন্ত্রীদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে
করেন, একটি ঘনিষ্ঠ মহলই সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং সেটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যখন মদীনার সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন, তখন সারাদেশে
আলেম-ওলামার ওপর পুলিশি নির্যাতন চলছে। সরকারের ভেতর সরকারের এ আলোচনা
বর্তমান আমলে নতুন নয়। বাংলাদেশের রাজধানীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে
হাওয়া হয়ে যাওয়া বালির অবস্থান কিভাবে ভারতীয় কারাগার হলো সে প্রশ্নের
উত্তরে গেলে হয়তো তার নাম এবং ধর্মই সবকিছু ছাপিয়ে অন্যকিছু উঠবে। তার চেয়ে
বড় কথা, এর মধ্য দিয়ে শত শত নিখোঁজ হওয়ার একটি সূত্রও সম্ভবত পাওয়া
যাচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষিতে সরকার ও নাগরিকদের সম্পর্কের প্রসঙ্গটি
গুরুতর। সংবিধান বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্ব মূলত সরকারের কর্মকা-ের মধ্য
দিয়েই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মানুষ গুম হয়ে গেলে এবং সরকার নিষ্ক্রীয় থাকলে
সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকার তার সীমায় না থাকলে নাগরিকদের
সীমানাও রক্ষিত থাকে না। জানমালের নিরাপত্তার যে প্রসঙ্গটি এখানে বড় হয়ে
দেখা দেয়, তার সাথেই আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। বলা অন্যায় নয়, সরকারের ভেতর
যদি সরকার থাকে আর সেই সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে তাহলে তো
বলাই যায়, জনগণ যাদেরকে নির্বাচিত করেছে আর যারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে
ছিনিমিনি খেলছে তারা এক নয়। দেশে দেশে স্বৈরাচার-স্বৈরশাসকদের নানা প্রসঙ্গ
আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে তবে নিজের দেশের নাগরিকদের বিদেশিদের কাছে
হস্তান্তর করার নজির সম্ভবত পৃথিবীতে এই প্রথম। আর সে কারণেই হয়তো অনেক
প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।