Friday, May 31, 2013
আমাদের বাস্তব জীবনে সুরা ফাতিহা
১.
সুরা ফাতিহার বিষয়বস্তু হলো বান্দাহর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক সবখানেই বান্দার অবস্থান কোথায় তা জানা দরকার। বান্দার ভেতর থেকেই এর জবাব পাওয়ার চেষ্টা যদি থাকে তবে, সুরা ফাতিহা এই জিজ্ঞাসার তৃষ্ণা মেটাতে মহাসমুদ্রের মতো তার সামনে এসে হাজির হয়।
এটি মূলত আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া একটি মানপত্র। যাতে আল্লাহর কাছে বান্দাহ তার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলছে। একটা মানপত্রের মতন এতেও তিনটি অংশ। প্রথমেই যার কাছে চাওয়া হচ্ছে তার প্রশংসা, তারপর যে বা যারা চাচ্ছে তার পরিচয়, সবশেষে বান্দাহর চাওয়া।
২.
আমরা বলি, আলহামদুলিল্লাহির রাব্বিল আলামীন। এখানে আল্লাহর প্রশংসাসূচক পরিচয়ে আমরা তাকে সম্বোধন করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আলামীনের রব। এখানে আল্লাহ, আলামীন ও রব তিনটি শব্দের গুরুত্ব বুঝলেই আল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ হলো এমন সত্তা যার উলুহিয়াত একচ্ছত্র। (উলুহিয়াত অর্থ হলো সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে এমন সত্তা)। আল ইলাহ অর্থ হলো একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ তিনিই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন। তারপর হলো রব। রাব্বুল আলামীন। অর্থ সকল জগতের রব। আলামীন অর্থ জগৎ। ডিপ সিতে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রোটোজোয়া এমিবা থাকে তার যেমন একটি জগৎ আছে, তেমনি ওই অনন্ত আলোকবর্ষ দূরের অজানা মহাশূন্যে, বড় বড় গ্যালাক্সিকে গিলে খাওয়া ব্ল্যাকহোলেরও একটা জগৎ আছে। বিচিত্র সব জগৎ : প্রাণী জগৎ, সমুদ্র জগৎ, মহাশূন্য জগৎ প্রভৃতি। বেড়ালের জগৎ, গরু-ছাগলের জগৎ, মশার জগৎ মৌমাছির জগৎ, প্রজাপতির জগৎ কিংবা ফুলের জগৎ। আবার আমাদের জীবনেও হাজারো জগৎ আছে। চিন্তার জগৎ, মনোজগৎ আরও লক্ষকোটি জগৎ। আল্লাহ, যিনি রাব্বুল আলামীন, এর অর্থ দাঁড়ায় তিনি এই সব জগতেরই পালনকর্তা। রব তাই এক অর্থে প্রতিপালক। তিনি জন্ম দিয়ে বা সৃষ্টি করেই বসে থাকেন না, তাদের চাওয়ার আগেই দরকার মতো প্রাপ্য দিয়ে দেন। যেমন বাতাস, পানি ইত্যাদি। বস্তু বা প্রাণী সবার প্রতিপালক।
বান্দাহর এতটুকু প্রশংসাতেই আল্লাহর গুণগান শেষ হয় না। তাই পরক্ষণেই বান্দাহ বলে, আররাহমানহির রাহিম। রাহমান ও রাহিম শব্দ দুটোর ভাব কাছাকাছি তবে তাৎপর্য আলাদা। আল্লাহ রাহমান অর্থাৎ দয়ালু। সেই সাথে তিনি রাহিম এর অর্থও দয়ালু। রাহমান হচ্ছেন ইহকালের জন্য। আর রাহীম হচ্ছেন পরকালের জন্য। পরের লাইনেই এই রাহিমকে ব্যালেন্স করার জন্যই আল্লাহ বান্দাহকে বলতে শেখালেন মালিকি ইয়াওমিদ্বীন। মালিক, ইয়ামুন এবং দ্বীন। তিনি বিচার দিনের মালিক। অর্থাৎ তিনি রাহিম বা দয়ালু ঠিক আছে, তবে ইনসাফ করার সময় তিনি ঠিকই সঠিক বিচার করবেন।
সুরা ফাতিহার এই পর্যন্ত হলো আল্লাহর পরিচয়। এখানে বান্দাহ কার নিকট থেকে এসেছে কিভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে এবং কোথায় যাবে তার বিষয়গুলো সুক্ষ্মভাবে লুকিয়ে আছে। সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। প্রতিপালন করছেন আল্লাহ। তারপর আবার তার নিকটই ফিরে যেতে হবে এবং প্রতিটি কাজের হিসাব তাকেই দিতে হবে।
সুরা ফাতিহার এর পরের অংশে রয়েছে বান্দাহর পরিচয়। ইয়াকানাবুদু ওয়া ইয়াকানাসতাইন। একমাত্র তোমারই ইবাদত করি আর তোমার নিকট সাহায্য চাই। অর্থাৎ বান্দাহর পরিচয় হলো, আমি আল্লাহর আবদ বা দাস। এটাই তার একমাত্র পরিচয়। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আবদ বা দাস ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। এর পূর্বেও সকল নবীগণ একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করে গেছেন। বান্দাহকে তাঁরই দাস হতে হবে। এটা হওয়া কর্তব্য। সেই সাথে সকল সাহায্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। কোনো পীর, মাজার, মন্ত্রী বা বস নেতার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। সুরা ফাতিহার এই অংশে বান্দাহ এটুকুই উপলব্ধি করে।
এক কথায় একজন মানুষ আল্লাহর দাস। সে তাঁর নিকট এটা বলে। এরপর তার চাওয়ার পালা। বান্দাহ চায়- ইহদিনাস সিরাত্বাল মুসতাকিম। আমাকে সরল সঠিক পথ দেখাও। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের আজ এটিই চাওয়া। সরল পথ চাওয়ার প্রবণতা প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সার্বজনীন চাওয়া। সেই সাথে বান্দাহর আরও চাওয়া-সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদদাল্লিন। ইনডাইরেক্টলি এই চাওয়ার ভেতরেই কিন্তু বান্দাহর পাওয়ার উত্তর আছে। সেই সব লোকের পথ যারা তোমার নিয়ামত পেয়েছে। এরা হলো চার শ্রেণী-নবী বা রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহ ব্যক্তিগণ। আবার পরক্ষণেই বলা হচ্ছে, তাদের পথ নয়, এরা হলো দুই শ্রেণী; মাগদুব এবং দুয়াল্লিন। অভিশপ্ত আর পথভ্রষ্ট। সুরা ফাতিহার এই দুইটি শ্রেণী কয়েকটি গোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করে। পথভ্রষ্ট মানে মুশরিকরা। যারা আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরিক করে। যেমন, নাসারা বা খ্রিস্টানরা আর মুশরিকরা। আবার অভিশপ্তরা হলো ইহুদী। অর্থাৎ সুরা ফাতিহার শেষ অংশে এসে আল্লাহকে বান্দাহ বলে, আমি যেন কোনোক্রমেই খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুশরিকদের পথ অনুসরণ না করি।
৩.
সুরা ফাতিহা আমার জন্য দিনে কমপক্ষে সতের বার পড়া ফরজ। এটি না পড়লে কেউ মুসলমান থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ কমপক্ষে সতের বার এটি পাঠ করছি অথচ আমার আচরণ বা চলাফেরা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিকদের মতোই যদি থেকে যায় তাহলে এই পড়ার স্বার্থকতা কোথায়?
মানুষ বেঁচে থাকে দুইটি বিষয়কে উপজীব্য করে : আমল ও আখলাখ। মারা গেলে আমল সাথে চলে যায় আর তার আখলাক বা চরিত্র দুনিয়ায় থেকে যায়। সবাই স্মরণ করে। তার চরিত্র কেমন ছিলো, লেনদেন, আচার আচরণ, চলাফেরা, পর্দা-পুশিদা কেমন ছিল ইত্যাদি নিয়েই আলোচনা হতে থাকবে। যদি আখলাক ভালো না হয় তাহলে তার মূল্য কোথায়? সঠিক আখলাকের অনুসরণ করাই সুরা ফাতিহার সিরাত্বাল মুস্তাকিম বা সরল পথ। সুরা ফাতিহার মূল বিষয়বস্তুতে এই বিষয়গুলোই স্পষ্টরূপে বার বার উদ্ভাসিত হতে থাকে।
Tuesday, May 28, 2013
মতিঝিলে ব্যাপক প্রাণহানির তথ্য সঠিক, তালিকা হচ্ছে :হেফাজত :: দৈনিক ইত্তেফাক
মতিঝিলে ব্যাপক প্রাণহানির তথ্য সঠিক, তালিকা হচ্ছে :হেফাজত
'বিএনপির নেতার কথায় আল্লামা শফী ফিরে যাননি'
চট্টগ্রাম অফিস
রাজধানীর শাপলা চত্বরে ৫ মে গভীর রাতে যৌথ অভিযানের পর প্রেসনোটের বক্তব্যকে বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে হেফাজতে ইসলাম উল্লেখ করেছে। হেফাজত নেতারা গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে প্রেসনোটের জবাব দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, মূলত ওই রাতে নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর যে বর্বরোচিত গণহত্যা চালানো হয়েছে তা ধামাচাপা দেয়ার জন্যই হেফাজতের ওপর দায় চাপিয়ে এই প্রেসনোট দেয়া হয়েছে। এতে নিহতদের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে তা শুধু হাস্যকরই নয়, উল্লেখিত সংখ্যার কারণেই পুরো প্রেসনোটটি অসত্য প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করা ও বিভিন্ন ভবনে ও অলিগলিতে আশ্রয় নেয়া লোককে অভয় দিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল মর্মে যে কথা বলা হয়েছে, তা নির্জলা মিথ্যা। ঘটনার ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সরকারের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। প্রেসনোটে পল্টন, গুলিস্তান ও বিজয় নগর এলাকায় ভাংচুর অগ্নিসংযোগের জন্য হেফাজত কর্মীদের দায়ী করে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে সেটিও সঠিক নয়। বরং ওইসব এলাকায় শাপলা চত্বরের দিকে আসতে থাকা হেফাজতের মিছিলের ওপর পুলিশ ও সরকারি দলের কর্মীরা হামলা চালায় এবং নিরীহ আলেমদের গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে। আর সরকারি দলের লোকেরা সরাসরি এবং কিছুসংখ্যক হেফাজত কর্মী সেজে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ করে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রওয়ানা হয়েও বিএনপির নেতৃপর্যায় থেকে ফোন পেয়ে শাপলা চত্বরে না গিয়ে ফিরে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তাও অসত্য। সরকারি দলের লোক ও পুলিশের বেপরোয়া আচরণে গুলিস্তান পল্টন এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির কারণে চরম নিরাপত্তাহীন বোধ করায় আল্লামা শফী শাপলা চত্বরে যেতে পারেননি।
হেফাজতে ইসলাম এই প্রেসনোট প্রত্যাখ্যান করে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য কমিশন গঠন করার আবারো দাবি জানাচ্ছে। প্রেসনোটটিকে একেবারেই বিভ্রান্তিমূলক মনে করছে। কারণ এতে কখন কার সিদ্ধান্তে কার কার নেতৃত্বে কিভাবে অভিযান চালানো হয়েছে, অভিযানে র্যাব পুলিশের কত সংখ্যক সদস্য, অফিসার অংশ নিয়েছেন, কতটি সাঁজোয়া যান ব্যবহার করা হয়েছে, তার উল্লেখ নেই। তথাকথিত অভিযানে কী পরিমাণ গুলি, টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে তারও কোন পরিসংখ্যান নেই। নিহতদের একটি হাস্যকর সংখ্যা দেয়া হলেও আহতদের কোন সংখ্যা দেয়া হয়নি।
ব্যাপক প্রাণহানির কথা গুজব নয়, সত্যি
শাপলা চত্বরে ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি গুজব নয়, একেবারেই সত্যি। ঘটনার পর সেখান থেকে লাশ সরিয়ে নেয়ার বিষয়টিও শতভাগ সত্য। তবে ওইদিন ঠিক কত লোক পুলিশের গুলি ও নির্মম পিটুনিতে শহীদ হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনই বলা যাচ্ছে না। সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ওই ঘটনার সঠিক খবর না দিলেও বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক হতাহতের বিষয়টি এসেছে এবং আসছে। সংখ্যাও শত শত বলে কোন কোন বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে আভাস দেয়া হয়েছে। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত পল্টন, গুলিস্তান বিজয় নগর এলাকায়ই ১৫ জনকে শহীদ করা হয়েছে। তাদের মৃতদেহের কয়েকটি পাশের দু'টি হাসপাতালে পাওয়া যায়। কয়েকটি লাশ সমাবেশস্থলে আনা হয়। আর দুয়েকটি লাশ গুম করা হয়। আর ঘটনাস্থলে কী পরিমাণ লাশ পড়ে ছিল তা ৭ মে দুয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি এবং কিছু ভিডিও চিত্র থেকেই অনুমান করা যায়। এই চিত্রগুলো অভিযানের শেষে শাপলা চত্বর সংলগ্ন সোনালী ব্যাংকের সিঁড়ি ও বারান্দা এবং কালভার্ট রোড ও তদসংলগ্ন গলি থেকে তোলা। ওইসব চিত্রেই ২০টির বেশি লাশ দেখা যাচ্ছে। ফলে পুরো এলাকায় আগে পরে কত সংখ্যক মানুষ শহীদ হয়েছিল তা অনুমান করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতেই লাশের সংখ্যা হাজার হাজার হওয়ার আশংকাটি আসছে।
বায়তুল মোকাররম গেট চাওয়া হয়েছিল
প্রেসনোটে বলা হয়েছে, সমাবেশ করার জন্য শাপলা চত্বরের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। আসলে এই বক্তব্য সত্য নয়। হেফাজতের পক্ষ থেকে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়। সরকার বায়তুল মোকাররমের অনুমতি না দিয়ে ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর দুপুরের দিকে শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দেয় আকস্মিকভাবে।
হেফাজত নাশকতা চালায়নি
প্রেসনোটে শাপলা চত্বরে আসার সময় হেফাজত কর্মীরা উচ্ছৃংখল আচরণ করে এবং নাশকতামূলক কাজ শুরু করে বলে যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। আসলে শুরু থেকেই পুলিশ ওই এলাকায় উস্কানিমূলক আচরণ করে। হেফাজত কর্মীদের পুলিশ মিছিলে ধাওয়া করে যেভাবে ওই এলাকায় পাখির মতো খুঁজে খুঁজে গুলি করছিল তাতে তাদের পক্ষে অগ্নিসংযোগ এবং নাশকতামূলক কাজ করার সুযোগ ছিল না। এমন ভীতিকর অবস্থা পুলিশ তৈরি করেছিল হেফাজত কর্মীদের লাশ রাস্তা থেকে তুলে আনার মতো সাহস পর্যন্ত কারো ছিল না যা টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে লক্ষ্য করা গেছে। হেফাজতে ইসলাম আগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং ওইদিনও শেষ পর্যন্ত শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে প্রমাণ করেছে অরাজনৈতিক এই সংগঠনটি কোনরকমের বিশৃংখলা ও নাশকতামূলক তত্পরতায় বিশ্বাস করে না।
পরিস্থিতিই হেফাজতকে অবস্থান করতে বাধ্য করে
প্রেসনোটে হেফাজতের অবস্থানকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং আল্লামা আহমদ শফী সমাবেশ স্থলে আসার পথে বিএনপির কোন নেতার ফোন পাওয়ার পর ফিরে যান বলে বলা হয়। এই বক্তব্যও সত্য নয়। প্রথম হেফাজত পরিস্থিতির কারণেই অবস্থান বহাল রাখতে বাধ্য হয়। প্রথম: পুলিশ দুপুর থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যে হেফাজতের অনেক নেতা কর্মী শহীদ হন এবং আহত হন। তাদের কয়েকজনরে লাশ সমাবেশস্থলে এসে যায়। এতে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। হেফাজতের পক্ষ থেকে পল্টন এলাকায় গুলি বন্ধ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশকে বার বার অনুরোধ করা হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। এই অবস্থায়ও আল্লামা শফী সন্ধ্যার পর সমাবেশ শেষ করার ঘোষণা দিতে রওয়ানা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথে এসে তিনি ভীতিকর পরিস্থিতি দেখে ফিরে যান লালবাগ মাদরাসায়। সেখানে পুলিশ প্রশাসনকে বিভিন্ন মাধ্যমে জানান যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এতে রাতে এই অবস্থায় এই লাখ লাখ লোককে ছেড়ে দিলে তারা কোথায় যাবেন। তাছাড়া পথে পথে যেভাবে হামলা হচ্ছে তাতে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা আছে। তিনি সকাল ৬টার মধ্যে নিজে শাপলা চত্বর গিয়ে সমাবেশ শেষ করে সবাইকে নিয়ে শাপলা চত্বর ছাড়ার কথা বার বার বলেন। কিন্তু প্রশাসন তার কথায় কর্ণপাত করেননি। এর সত্যতা মিলে শাপলা চত্বরের স্টেজ থেকে বার বার বলা হয় আল্লামা শফী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অবস্থান অব্যাহত থাকবে। কখনো বলা হয়নি, লাগাতার অবস্থান চলতে থাকবে। এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সেটি হচ্ছে- হেফাজতের সমাবেশের অনুমতির বিষয়, অবস্থান করা না করার বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা সবই হয় প্রশাসনের সাথে কিন্তু আমরা দেখছি প্রেসনোটে বিএনপির নেতার কথা বলার পর আল্লামা শফী ফিরে গিয়েছেন বলা হয়েছে। এটা সত্য নয়। অন্যদিকে হেফাজকে অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা পুলিশ প্রশাসন আহবান জানাতে পারেন। কিন্তু সেদিন দুই দফায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম হেফাজতকে সরে যাওয়ার জন্য সময় বেধে দিচ্ছিলেন এবং কঠোর পদক্ষেপের কথা বলছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয় হেফাজতের ওপর হামলার সাথে পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলও জড়িত ছিল এবং পল্টনে নাশকতার পিছনেও সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বুঝা যায়।
হেফাজতকে দমন করতেই অভিযান
প্রেস নোটে জনগণের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার জন্য অভিযান অপরিহার্য হয়ে উঠে বলে বলা হয়। এটিও বাস্তবতার পরিপন্থি। হেফাজত কর্মীদের মূল অবস্থান ছিল দৈনিক বাংলার মোড় থেকে শাপলা চত্বর, ওইদিকে টিকাটুলি মোড় এবং বিপরীত দিকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত। এই এলাকার মধ্যে কোন সহিংসতার ঘটনাই ঘটেনি। পুলিশ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করলে হেফাজতের কর্মীরা রাত যাপন করেই সকালে স্থান ত্যাগ করতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে উস্কানিমূলক আচরণ এবং বেপরোয়া গুলিবর্ষণ ও হামলার মাধ্যমে সৃষ্ট ঘটনাকে পুঁজি করে নিরাপরাধ ঘুমন্ত মানুষের ওপর যৌথ অভিযান চালানোর কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। প্রেসনোটে দুয়েকটি মিডিয়া নাকি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিল বলা হচ্ছে। বড় সমাবেশে নেতা কর্মীরা নানা ধরনের কথা বলতেই পারে। তাছাড়া দুপুর থেকে পুলিশের গুলিতে হেফাজত কর্মী নিহত হওয়ার খবরে অপরপ্রান্তে ক্ষোভ দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ক্ষুব্ধ কর্মীদের কোন বক্তব্য কোন দিনই পুরো সংগঠনের বক্তব্য হতে পারে না। অতএব কোন টেলিভিশনে কোন ক্ষুব্ধ কর্মীর মন্তব্যকে অভিযান চালানোর পক্ষে অযুহাত হিসেবে দাঁড় করানো কোন দায়িত্বশীল সরকারের কাছ থেকে আশা করা যায় না।
ঘটনা পরম্পরা এবং সরকারের নানা আচরণ থেকে এখন এটা পরিষ্কার যে সরকার হেফাজতের ঈমানী আন্দোলনকে দমানোর জন্য এই অভিযান চালিয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় সেদিন রাতে অভিযান চালায় এবং ঘুমন্ত জিকির ও নামাজরত আলেম ও তৌহিদী জনতাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করে শত শত লোককে আহত নিহত করে। সেখানে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জানে ফিরে আসা অনেকে সেই ভীতিকর পরিস্থিতিকে কেয়ামতের ময়দানের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেছেন।
প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার কথা ঠিক নয়
হেফাজতকর্মীদের ওপর অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে যে কথা প্রেস নোটে বলা হয়েছে তা মোটেও সঠিক নয়। অভিযানকালে যৌথবাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে, গুলি খেয়ে ছটপট করে ঘটনাস্থলে অসংখ্য মানুষ মরে পড়ে থাকার ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেখানে পুলিশ র্যাবকে আহত ব্যক্তিদের মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুলি করতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া লোকদের নিরাপদে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করার দাবিও সত্য নয় শেষের দিকে মিডিয়াকে দেখানোর জন্য কিছু লোকের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত অধিকাংশ ভিডিও চিত্রে দেখা যায় কিভাবে পলায়নপর আলেমদের পাখি শিকারের মতো গুলি করা হয়, লাঠিপেটা করা হয় এবং তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। অনেক আলেমকে অপমান করে কান ধরে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এমন অসভ্য বর্বর আচরণের পরও প্রেস নোটে এমন বক্তব্য সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। যদি যৌথবাহিনীর অভিযানে কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা না হয় তাহলে দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্টে ৫৬ জন, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় ১৩ জন লোকের মৃত্যু কীভাবে হল?
ফোন ইন্টারনেটেই সঠিক চিত্র আসছে
প্রেস নোটে বলা হয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও ইন্টারনেটের যুগে হত্যাকাণ্ড লাশ গুম করার কথা অবিশ্বাস্য। বাস্তবতা হচ্ছে সরকার দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে অন্য টেলিভিশনগুলোকে চাপের মুখে ফেলে ঘটনার সঠিক চিত্র প্রকাশের ওপর অঘোষিত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেক টিভি চ্যানেলের কাছে ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তারা তা প্রচার থেকে বিরত থাকছে বলে আমরা জানতে পারছি। তাছাড়া অভিযানের সকল দিকে সকল পর্যায়ে মিডিয়াকে যেতে দেয়া হয়নি এবং কোন কোন মিডিয়ার সাংবাদিক যৌথবাহিনীর হুমকির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে হ্যাঁ ইন্টারনেটে ঠিকই অভিযানের নির্মমতার ছবি আসছে এবং সেগুলোই অভিযানের নামে সরকারের গণহত্যাকে প্রমাণ করছে।
পরিবারের আহাজারি প্রসঙ্গ
আলেমদের ওপর নির্মম অভিযান চালিয়ে শত শত লোককে হত্যার পর প্রেস নোটে স্বজনদের কাছ থেকে আহাজারি আশা করার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এতো বড় অভিযান চালিয়ে আলেমদের ওপর জুলুম করার পর উল্টো আলেমদের নামে ২০টির বেশি মামলা করে লাখ লাখ লোককে আসামি করা হলো। হেফাজতের মহাসচিবকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হলো। এই অবস্থায় মাজলুমদের ওপর সরকারের জুলুম অব্যাহত থাকলে এমন পরিস্থিতিতে কে কোথায় আছে, কার লাশ কোথায় রাখা হয়েছে এসব তথ্য পেতেও বেগ পেতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে্ই অনেক স্থানে শহীদকে দাফন করা হয়েছে। যাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে না খবর নেয়া হচ্ছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে পরিসংখ্যান তৈরি হচ্ছে। স্বজনরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদরাসায় সন্ধান করছেন।
হেফাজতে ইসলাম ৫ মের ঘটনা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত না করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, আহত নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া, নিহতদের লাশের সন্ধান দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবারো দাবি জানাচ্ছে। একই সাথে হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা তুলে নিয়ে আটক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ সকল নেতাকর্মীদের মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে হেফাজতের ১৩ দফা ঈমানী দাবি মেনে নেয়ার জন্যও দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় হেফাজত ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করবে ইনশাল্লাহ।
মামলা প্রত্যাহারের দাবি
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত ওলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, বর্তমান নাস্তিকদের দোসর সরকার নিরস্ত্র নিরীহ তৌহিদী জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অনেক তৌহিদী জনতাকে নির্মমভাবে শহীদ করেছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে এবং অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। সরকার এ সকল কার্যক্রমের মাধ্যমে মূলত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমরা সর্বস্তরের আলেম ওলামা ও তৌহিদী জনতা এ সকল কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, আমরা সরকারের নিকট আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ গ্রেফতারকৃত হেফাজতে ইসলামের সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি এবং দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
গতকাল সকালে জামিয়া আজিজুল উলুম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওলামা ও প্রতিনিধি সমাবেশে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রধান অতিথির ভাষণে বক্তব্য রাখেন। মাওলানা হাফেজ তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নায়েবে আমীর মাওলানা শামসুল আলম, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ, মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির, মাওলানা মীর মুহাম্মদ ইদরিস, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী, মাওলানা জুনাইদ, মাওলানা আহমদুল্লাহ, মাওলানা আবদুর রহমান, মাওলানা মুহাম্মদ নাসিম প্রমুখ।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ গ্রেফতারকৃত সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গতকাল বিকালে নাজিরহাট বড় মাদরাসার পরিচালক আল্লামা শাহ মুহাম্মদ ইদরিসের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, মূলত ওই রাতে নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর যে বর্বরোচিত গণহত্যা চালানো হয়েছে তা ধামাচাপা দেয়ার জন্যই হেফাজতের ওপর দায় চাপিয়ে এই প্রেসনোট দেয়া হয়েছে। এতে নিহতদের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে তা শুধু হাস্যকরই নয়, উল্লেখিত সংখ্যার কারণেই পুরো প্রেসনোটটি অসত্য প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করা ও বিভিন্ন ভবনে ও অলিগলিতে আশ্রয় নেয়া লোককে অভয় দিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল মর্মে যে কথা বলা হয়েছে, তা নির্জলা মিথ্যা। ঘটনার ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সরকারের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। প্রেসনোটে পল্টন, গুলিস্তান ও বিজয় নগর এলাকায় ভাংচুর অগ্নিসংযোগের জন্য হেফাজত কর্মীদের দায়ী করে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে সেটিও সঠিক নয়। বরং ওইসব এলাকায় শাপলা চত্বরের দিকে আসতে থাকা হেফাজতের মিছিলের ওপর পুলিশ ও সরকারি দলের কর্মীরা হামলা চালায় এবং নিরীহ আলেমদের গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে। আর সরকারি দলের লোকেরা সরাসরি এবং কিছুসংখ্যক হেফাজত কর্মী সেজে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ করে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রওয়ানা হয়েও বিএনপির নেতৃপর্যায় থেকে ফোন পেয়ে শাপলা চত্বরে না গিয়ে ফিরে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তাও অসত্য। সরকারি দলের লোক ও পুলিশের বেপরোয়া আচরণে গুলিস্তান পল্টন এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির কারণে চরম নিরাপত্তাহীন বোধ করায় আল্লামা শফী শাপলা চত্বরে যেতে পারেননি।
হেফাজতে ইসলাম এই প্রেসনোট প্রত্যাখ্যান করে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য কমিশন গঠন করার আবারো দাবি জানাচ্ছে। প্রেসনোটটিকে একেবারেই বিভ্রান্তিমূলক মনে করছে। কারণ এতে কখন কার সিদ্ধান্তে কার কার নেতৃত্বে কিভাবে অভিযান চালানো হয়েছে, অভিযানে র্যাব পুলিশের কত সংখ্যক সদস্য, অফিসার অংশ নিয়েছেন, কতটি সাঁজোয়া যান ব্যবহার করা হয়েছে, তার উল্লেখ নেই। তথাকথিত অভিযানে কী পরিমাণ গুলি, টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে তারও কোন পরিসংখ্যান নেই। নিহতদের একটি হাস্যকর সংখ্যা দেয়া হলেও আহতদের কোন সংখ্যা দেয়া হয়নি।
ব্যাপক প্রাণহানির কথা গুজব নয়, সত্যি
শাপলা চত্বরে ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি গুজব নয়, একেবারেই সত্যি। ঘটনার পর সেখান থেকে লাশ সরিয়ে নেয়ার বিষয়টিও শতভাগ সত্য। তবে ওইদিন ঠিক কত লোক পুলিশের গুলি ও নির্মম পিটুনিতে শহীদ হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনই বলা যাচ্ছে না। সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ওই ঘটনার সঠিক খবর না দিলেও বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক হতাহতের বিষয়টি এসেছে এবং আসছে। সংখ্যাও শত শত বলে কোন কোন বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে আভাস দেয়া হয়েছে। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত পল্টন, গুলিস্তান বিজয় নগর এলাকায়ই ১৫ জনকে শহীদ করা হয়েছে। তাদের মৃতদেহের কয়েকটি পাশের দু'টি হাসপাতালে পাওয়া যায়। কয়েকটি লাশ সমাবেশস্থলে আনা হয়। আর দুয়েকটি লাশ গুম করা হয়। আর ঘটনাস্থলে কী পরিমাণ লাশ পড়ে ছিল তা ৭ মে দুয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি এবং কিছু ভিডিও চিত্র থেকেই অনুমান করা যায়। এই চিত্রগুলো অভিযানের শেষে শাপলা চত্বর সংলগ্ন সোনালী ব্যাংকের সিঁড়ি ও বারান্দা এবং কালভার্ট রোড ও তদসংলগ্ন গলি থেকে তোলা। ওইসব চিত্রেই ২০টির বেশি লাশ দেখা যাচ্ছে। ফলে পুরো এলাকায় আগে পরে কত সংখ্যক মানুষ শহীদ হয়েছিল তা অনুমান করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতেই লাশের সংখ্যা হাজার হাজার হওয়ার আশংকাটি আসছে।
বায়তুল মোকাররম গেট চাওয়া হয়েছিল
প্রেসনোটে বলা হয়েছে, সমাবেশ করার জন্য শাপলা চত্বরের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। আসলে এই বক্তব্য সত্য নয়। হেফাজতের পক্ষ থেকে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়। সরকার বায়তুল মোকাররমের অনুমতি না দিয়ে ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর দুপুরের দিকে শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দেয় আকস্মিকভাবে।
হেফাজত নাশকতা চালায়নি
প্রেসনোটে শাপলা চত্বরে আসার সময় হেফাজত কর্মীরা উচ্ছৃংখল আচরণ করে এবং নাশকতামূলক কাজ শুরু করে বলে যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। আসলে শুরু থেকেই পুলিশ ওই এলাকায় উস্কানিমূলক আচরণ করে। হেফাজত কর্মীদের পুলিশ মিছিলে ধাওয়া করে যেভাবে ওই এলাকায় পাখির মতো খুঁজে খুঁজে গুলি করছিল তাতে তাদের পক্ষে অগ্নিসংযোগ এবং নাশকতামূলক কাজ করার সুযোগ ছিল না। এমন ভীতিকর অবস্থা পুলিশ তৈরি করেছিল হেফাজত কর্মীদের লাশ রাস্তা থেকে তুলে আনার মতো সাহস পর্যন্ত কারো ছিল না যা টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে লক্ষ্য করা গেছে। হেফাজতে ইসলাম আগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং ওইদিনও শেষ পর্যন্ত শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে প্রমাণ করেছে অরাজনৈতিক এই সংগঠনটি কোনরকমের বিশৃংখলা ও নাশকতামূলক তত্পরতায় বিশ্বাস করে না।
পরিস্থিতিই হেফাজতকে অবস্থান করতে বাধ্য করে
প্রেসনোটে হেফাজতের অবস্থানকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং আল্লামা আহমদ শফী সমাবেশ স্থলে আসার পথে বিএনপির কোন নেতার ফোন পাওয়ার পর ফিরে যান বলে বলা হয়। এই বক্তব্যও সত্য নয়। প্রথম হেফাজত পরিস্থিতির কারণেই অবস্থান বহাল রাখতে বাধ্য হয়। প্রথম: পুলিশ দুপুর থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যে হেফাজতের অনেক নেতা কর্মী শহীদ হন এবং আহত হন। তাদের কয়েকজনরে লাশ সমাবেশস্থলে এসে যায়। এতে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। হেফাজতের পক্ষ থেকে পল্টন এলাকায় গুলি বন্ধ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশকে বার বার অনুরোধ করা হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। এই অবস্থায়ও আল্লামা শফী সন্ধ্যার পর সমাবেশ শেষ করার ঘোষণা দিতে রওয়ানা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথে এসে তিনি ভীতিকর পরিস্থিতি দেখে ফিরে যান লালবাগ মাদরাসায়। সেখানে পুলিশ প্রশাসনকে বিভিন্ন মাধ্যমে জানান যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এতে রাতে এই অবস্থায় এই লাখ লাখ লোককে ছেড়ে দিলে তারা কোথায় যাবেন। তাছাড়া পথে পথে যেভাবে হামলা হচ্ছে তাতে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা আছে। তিনি সকাল ৬টার মধ্যে নিজে শাপলা চত্বর গিয়ে সমাবেশ শেষ করে সবাইকে নিয়ে শাপলা চত্বর ছাড়ার কথা বার বার বলেন। কিন্তু প্রশাসন তার কথায় কর্ণপাত করেননি। এর সত্যতা মিলে শাপলা চত্বরের স্টেজ থেকে বার বার বলা হয় আল্লামা শফী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অবস্থান অব্যাহত থাকবে। কখনো বলা হয়নি, লাগাতার অবস্থান চলতে থাকবে। এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সেটি হচ্ছে- হেফাজতের সমাবেশের অনুমতির বিষয়, অবস্থান করা না করার বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা সবই হয় প্রশাসনের সাথে কিন্তু আমরা দেখছি প্রেসনোটে বিএনপির নেতার কথা বলার পর আল্লামা শফী ফিরে গিয়েছেন বলা হয়েছে। এটা সত্য নয়। অন্যদিকে হেফাজকে অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা পুলিশ প্রশাসন আহবান জানাতে পারেন। কিন্তু সেদিন দুই দফায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম হেফাজতকে সরে যাওয়ার জন্য সময় বেধে দিচ্ছিলেন এবং কঠোর পদক্ষেপের কথা বলছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয় হেফাজতের ওপর হামলার সাথে পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলও জড়িত ছিল এবং পল্টনে নাশকতার পিছনেও সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বুঝা যায়।
হেফাজতকে দমন করতেই অভিযান
প্রেস নোটে জনগণের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার জন্য অভিযান অপরিহার্য হয়ে উঠে বলে বলা হয়। এটিও বাস্তবতার পরিপন্থি। হেফাজত কর্মীদের মূল অবস্থান ছিল দৈনিক বাংলার মোড় থেকে শাপলা চত্বর, ওইদিকে টিকাটুলি মোড় এবং বিপরীত দিকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত। এই এলাকার মধ্যে কোন সহিংসতার ঘটনাই ঘটেনি। পুলিশ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করলে হেফাজতের কর্মীরা রাত যাপন করেই সকালে স্থান ত্যাগ করতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে উস্কানিমূলক আচরণ এবং বেপরোয়া গুলিবর্ষণ ও হামলার মাধ্যমে সৃষ্ট ঘটনাকে পুঁজি করে নিরাপরাধ ঘুমন্ত মানুষের ওপর যৌথ অভিযান চালানোর কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। প্রেসনোটে দুয়েকটি মিডিয়া নাকি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিল বলা হচ্ছে। বড় সমাবেশে নেতা কর্মীরা নানা ধরনের কথা বলতেই পারে। তাছাড়া দুপুর থেকে পুলিশের গুলিতে হেফাজত কর্মী নিহত হওয়ার খবরে অপরপ্রান্তে ক্ষোভ দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ক্ষুব্ধ কর্মীদের কোন বক্তব্য কোন দিনই পুরো সংগঠনের বক্তব্য হতে পারে না। অতএব কোন টেলিভিশনে কোন ক্ষুব্ধ কর্মীর মন্তব্যকে অভিযান চালানোর পক্ষে অযুহাত হিসেবে দাঁড় করানো কোন দায়িত্বশীল সরকারের কাছ থেকে আশা করা যায় না।
ঘটনা পরম্পরা এবং সরকারের নানা আচরণ থেকে এখন এটা পরিষ্কার যে সরকার হেফাজতের ঈমানী আন্দোলনকে দমানোর জন্য এই অভিযান চালিয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় সেদিন রাতে অভিযান চালায় এবং ঘুমন্ত জিকির ও নামাজরত আলেম ও তৌহিদী জনতাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করে শত শত লোককে আহত নিহত করে। সেখানে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জানে ফিরে আসা অনেকে সেই ভীতিকর পরিস্থিতিকে কেয়ামতের ময়দানের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেছেন।
প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার কথা ঠিক নয়
হেফাজতকর্মীদের ওপর অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে যে কথা প্রেস নোটে বলা হয়েছে তা মোটেও সঠিক নয়। অভিযানকালে যৌথবাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে, গুলি খেয়ে ছটপট করে ঘটনাস্থলে অসংখ্য মানুষ মরে পড়ে থাকার ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেখানে পুলিশ র্যাবকে আহত ব্যক্তিদের মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুলি করতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া লোকদের নিরাপদে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করার দাবিও সত্য নয় শেষের দিকে মিডিয়াকে দেখানোর জন্য কিছু লোকের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত অধিকাংশ ভিডিও চিত্রে দেখা যায় কিভাবে পলায়নপর আলেমদের পাখি শিকারের মতো গুলি করা হয়, লাঠিপেটা করা হয় এবং তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। অনেক আলেমকে অপমান করে কান ধরে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এমন অসভ্য বর্বর আচরণের পরও প্রেস নোটে এমন বক্তব্য সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। যদি যৌথবাহিনীর অভিযানে কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা না হয় তাহলে দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্টে ৫৬ জন, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় ১৩ জন লোকের মৃত্যু কীভাবে হল?
ফোন ইন্টারনেটেই সঠিক চিত্র আসছে
প্রেস নোটে বলা হয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও ইন্টারনেটের যুগে হত্যাকাণ্ড লাশ গুম করার কথা অবিশ্বাস্য। বাস্তবতা হচ্ছে সরকার দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে অন্য টেলিভিশনগুলোকে চাপের মুখে ফেলে ঘটনার সঠিক চিত্র প্রকাশের ওপর অঘোষিত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেক টিভি চ্যানেলের কাছে ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তারা তা প্রচার থেকে বিরত থাকছে বলে আমরা জানতে পারছি। তাছাড়া অভিযানের সকল দিকে সকল পর্যায়ে মিডিয়াকে যেতে দেয়া হয়নি এবং কোন কোন মিডিয়ার সাংবাদিক যৌথবাহিনীর হুমকির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে হ্যাঁ ইন্টারনেটে ঠিকই অভিযানের নির্মমতার ছবি আসছে এবং সেগুলোই অভিযানের নামে সরকারের গণহত্যাকে প্রমাণ করছে।
পরিবারের আহাজারি প্রসঙ্গ
আলেমদের ওপর নির্মম অভিযান চালিয়ে শত শত লোককে হত্যার পর প্রেস নোটে স্বজনদের কাছ থেকে আহাজারি আশা করার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এতো বড় অভিযান চালিয়ে আলেমদের ওপর জুলুম করার পর উল্টো আলেমদের নামে ২০টির বেশি মামলা করে লাখ লাখ লোককে আসামি করা হলো। হেফাজতের মহাসচিবকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হলো। এই অবস্থায় মাজলুমদের ওপর সরকারের জুলুম অব্যাহত থাকলে এমন পরিস্থিতিতে কে কোথায় আছে, কার লাশ কোথায় রাখা হয়েছে এসব তথ্য পেতেও বেগ পেতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে্ই অনেক স্থানে শহীদকে দাফন করা হয়েছে। যাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে না খবর নেয়া হচ্ছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে পরিসংখ্যান তৈরি হচ্ছে। স্বজনরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদরাসায় সন্ধান করছেন।
হেফাজতে ইসলাম ৫ মের ঘটনা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত না করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, আহত নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া, নিহতদের লাশের সন্ধান দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবারো দাবি জানাচ্ছে। একই সাথে হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা তুলে নিয়ে আটক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ সকল নেতাকর্মীদের মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে হেফাজতের ১৩ দফা ঈমানী দাবি মেনে নেয়ার জন্যও দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় হেফাজত ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করবে ইনশাল্লাহ।
মামলা প্রত্যাহারের দাবি
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত ওলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, বর্তমান নাস্তিকদের দোসর সরকার নিরস্ত্র নিরীহ তৌহিদী জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অনেক তৌহিদী জনতাকে নির্মমভাবে শহীদ করেছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে এবং অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। সরকার এ সকল কার্যক্রমের মাধ্যমে মূলত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমরা সর্বস্তরের আলেম ওলামা ও তৌহিদী জনতা এ সকল কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, আমরা সরকারের নিকট আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ গ্রেফতারকৃত হেফাজতে ইসলামের সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি এবং দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
গতকাল সকালে জামিয়া আজিজুল উলুম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওলামা ও প্রতিনিধি সমাবেশে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রধান অতিথির ভাষণে বক্তব্য রাখেন। মাওলানা হাফেজ তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নায়েবে আমীর মাওলানা শামসুল আলম, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ, মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির, মাওলানা মীর মুহাম্মদ ইদরিস, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী, মাওলানা জুনাইদ, মাওলানা আহমদুল্লাহ, মাওলানা আবদুর রহমান, মাওলানা মুহাম্মদ নাসিম প্রমুখ।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীসহ গ্রেফতারকৃত সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গতকাল বিকালে নাজিরহাট বড় মাদরাসার পরিচালক আল্লামা শাহ মুহাম্মদ ইদরিসের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
Monday, May 27, 2013
সরকারের ভেতরে সরকার সুখরঞ্জন ও গুমসূত্র
সরকারের ভেতরে সরকার সুখরঞ্জন ও গুমসূত্র
আবদুল
আউয়াল ঠাকুর :সুখরঞ্জন বালির খোঁজ পাওয়া গেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কঠোর
নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে যিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন তাকে পাওয়া গেছে ভারতের
পশ্চিম বাংলার দমদম কারাগারে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে
মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বালি নিখোঁজ হয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক আদালত চত্বরে
আইনজীবীর গাড়ি থেকে। তার নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও
সরকারি মহল থেকে কোন উচ্চবাচ্য করা হয়নি। তখন থেকেই এটি রহস্যাবৃত্ত মনে
হয়েছিল। কারণ যিনি বা যারা সুখরঞ্জন বালির আদালত চত্বরে আসার খবর রেখেছেন
তারা তার হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কিছু জানেন না এমনটা মনে করার সঙ্গত কোন
কারণ ছিল না। রহস্যের হঠাৎ করেই উন্মোচন হয়েছে, নিউইয়র্ক ভিত্তিক
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বাংলাদেশের ইংরেজি
দৈনিক দ্যা নিউ এইজের মাধ্যমে। এইজের প্রতিবেদনে দমদম কারাগারে বালি আটক
রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। খবর পাওয়ার পর ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে কারাগারে
বালির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এইজের
কাছে দেয়া বিবৃতিতে বালি বলেছেন, গত বছরের ৫ নভেম্বর সকালে আন্তর্জাতিক
ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে অপহরণ করে একটি অফিসে
নিয়ে যায় এবং এরপর ৬ সপ্তাহ আটক রেখে ২৩ ডিসেম্বর সীমান্তে নিয়ে গিয়ে
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ তার সাথে দুব্যর্বহার
করে, মারধর করে এবং এরপর একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে
যাওয়া হয় স্বরূপনগর থানায়। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুখরঞ্জন বালি তার
ভাই পরিতোষ বালির সাথে সাক্ষাতের জন্য সীমান্ত পার হতে গিয়ে ধরা পড়েছেন।
অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি এখন কারাগারে
রয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের আলোচনায় শুধু সুখরঞ্জন বালি নয় বরং এমনতর
বহুজনের আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুখরঞ্জন বালির আলোচনা হয়তো আর
দশ জনের মতোই হারিয়ে যেতে পারতো। তবে ব্যতিক্রম এই যে, তিনি এমন এক মামলার
সাক্ষী যার সাক্ষ্যের ওপর আসামির দন্ডাদেশের অনেক কিছু নির্ভরশীল। এর আগেই
তিনি প্রকাশ্যত বলেছেন, তার ভাই বিষবালি হত্যাকান্ডের সাথে মাওলানা
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যুক্ত ছিলেন না। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং
দেইল্লা রাজাকার সম্পর্কিত যে আলোচনা সে ক্ষেত্রে বালির সাক্ষ্য
গুরুত্বপূর্ণ। বালি সরকারের সাথে একমত পোষণ না করার কারণে নানামুখী
নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। বারবারই বালি একথা বলেছেন, আমি মিথ্যা বলতে
পারবো না। যে দুটি মামলায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ
হয়েছে তার একটি বিষবালি হত্যা মামলা। সুতরাং একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী
হাওয়া হয়ে গেলো এবং তার কোন খোঁজ সরকারি পক্ষ থেকে নেয়া হলো না এটি
গ্রহণযোগ্য নয়। অন্তত সারাদেশে যারা ফাঁসির দাবিতে বাজার গরম করে রেখেছেন
তাদেরও কোন উচ্চবাচ্য না থাকায় বিষয়টির রহস্য নিয়ে প্রশ্ন না উঠার কোন
সুযোগ নেই। রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব ছিল তার সাক্ষীকে হাজির করা। অন্যদিকে
সাক্ষী এবং একজন নাগরিক কিভাবে হাওয়া হয়ে গেলো সে সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট
বক্তব্য পাওয়া না গেলে সামগ্রিকভাবেই জনগণের নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি গুরুতর
বিবেচনায় ওঠে আসে। প্রকাশ্যে অপহৃত তারপর হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটির
পাশাপাশি বালিকে ভারতে পাওয়ার আলোচনা খানিকটা নির্দেশক। বালিকে যেভাবে
হস্তান্তর করা হয়েছে অন্তত যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, বর্তমান আমলে একে
অবিশ্বাস্য মনে করার কোন কারণ নেই। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল, উলফা প্রধান
অরবিন্দ রাজখোয়ার ব্যাপারেও। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হস্তান্তরের কথা স্বীকার
করা না হলেও প্রভাবশালী ভারতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাজখোয়া নিজেই
স্বীকার করেন, ২০০৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে
ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে প্রকাশিত বিভিন্ন
খবরে বলা হয়েছে, এ ধরনের লোকদেরকে গ্রেফতার করার পরে সীমান্তের নির্দিষ্ট
স্থানে ছেড়ে দেয়া হয় এবং এর পরপরই ভারতীয় বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে যায়।
উলফার সামরিক শাখার উপপ্রধান রাজু বড়–য়া, পররাষ্ট্র শাখা প্রধান শশধর, অর্থ
শাখার প্রধান বিএন হাজারিকা, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক প্রণতি ডেকা ও তাদের
স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ পরিবার-পরিজনকেও একইভাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া
হয়েছে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্যা টেলিগ্রাফের খবরে
বলা হয়েছে, এক রাতেই উলফার অন্তত ২৮ জন নেতাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী
বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে,
তুলে দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের গোচরে নেই বলে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং প্রাসঙ্গিক নানাজনের খবর অনুযায়ী,
এটা বলা হয়, কেবলমাত্র আলোচ্যদেরই নয়, বরং এর বাইরেও বাংলাদেশে অবস্থানরত
অনেককেই বর্তমান সরকারের আমলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা
হয়েছে। এখানে ভারতীয়দের নিরাপত্তার যে মৌলিক বিষয়টি রয়েছে সে আলোচনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভারত সফরের সময়ও উঠে
এসেছে। ভারতীয়দের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে উদ্বিগ্নতার বিবেচনায় বাংলাদেশ
সরকারকে যে কাজে লাগাতে চায় সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভারতীয়দের সমর্থন
অসমর্থনের নানামাত্রিক সম্পর্ক যে রয়েছে এটা নতুন কিছু নয়। ভারত তো চীন নয়
যে, কেবলমাত্র পারস্পরিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক
রক্ষা করবে বরং ভারত হচ্ছে, কৌটল্যের নীতি এবং ম্যাকিয়াভেলীর তত্ত্বে
বিশ্বাসী। সুতরাং তার নিজের স্বার্থ সে দেখবে এতে অবাক হওয়ার কিছু না
থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কতটা আন্তরিক অথবা আন্তরিকতাকে
বিবেচ্য বলে মনে করছে কিনা সেটিই দেখার। নানাদিক থেকে প্রাসঙ্গিক আলোচনায়
রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের যে প্রসঙ্গ রয়েছে সে ক্ষেত্রেও একে এড়িয়ে যাবার কোন
সুযোগ নেই। সরকার কার্যত জাতীয় না, ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে সে বিতর্ক
কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। রাজনীতি বর্তমানে যে জটিল চক্রে রয়েছে
সেখানে জাতীয় স্বার্থের আলোচনা সর্বাগ্রে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতীয় স্বার্থ
রক্ষা এবং নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে একত্রে গ্রহণ করা সম্ভব কিনা
সে আলোচনায় হয়তো নানা প্রসঙ্গ উঠে আসতে পারে। তবে চীন যেভাবে পাকিস্তানের
বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তেমনিভাবে বাংলাদেশের পাশে ভারত দাঁড়াতে চাইলে
হয়তো আলোচনা ভিন্ন হতে পারতো। গভীর বিশ্লেষণে না গিয়েও বলা যায়, এ অঞ্চলে
ভারত, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল, মেক্সিকোর সাথে আমেরিকা এবং কিউবার সম্পর্ক
এরকম কিছু আলোচনা বাদ দিলে পৃথিবীর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমান্ত বিরোধকে কোন
গভীর বিবেচনায় নেয়া হয় না। সীমান্ত থাকলেও তাকে খুব কঠিনভাবে দেখার সুযোগ
থাকে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অনেক দেশই তাদের অংশভুক্ত দরিদ্র
দেশগুলোকে রক্ষার জন্য মুক্তহস্তে এগিয়ে আসছে। সুখরঞ্জন বালির আলোচনা
এক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিকতার সৃষ্টি করেছে। হয়তো নামের জন্যই বালি এখনও টিকে
আছে। নয়তো অন্যকিছু হতে পারতো। বিবিসি কেন সুখরঞ্জন বালির স্বপ্রণোদিত
সীমান্ত অতিক্রমণের অবৈধ চেষ্টার প্রসঙ্গটিকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে তা
পরিষ্কার নয়। তবে এটা বোঝা যায়, বালির সাথে ভারতীয়দের আচরণ রহস্যজনক।
বাংলাদেশের একজন সাধারণ হিন্দু নাগরিকের সীমান্ত অতিক্রমণ নিয়ে এতো কিছুর
কোন প্রয়োজন ছিল না। একজন কাঠমিস্ত্রীকে নির্যাতনের পর হাসপাতালে ভর্তি
করার মতো বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতেই বোঝা যায়, তাকে হস্তান্তরের
আগে এমন কিছু তথ্য ভারতীয়দের কাছে দেয়া হয়েছে যা ভারতীয় স্বার্থ বিরোধী।
হয়তো এসবের পূর্ণ বিবরণ পেতে আরো কিছু সময় নিবে। তবুও এটা মনে করার
যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে, বালি হয়তো মিস রিপোর্টিংয়ের শিকার হয়ে থাকতে
পারেন। ব্যাপারটি অনেকটা বাংলাদেশের মোবারকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের মোবারক মিস রিপোর্টিংয়ের জন্য পৃথিবীর জঘন্য কারাগার
গুয়ান্তনামাবেতে অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পাকিস্তান গিয়েছিলেন
ধর্ম বিদ্যা শিখতে। সেখান থেকে আগ্রাসী যৌথবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়
বিপজ্জনক সন্ত্রাসী হিসেবে। তার পরের ঘটনা বিশ্ববাসী জেনেছে। বাংলাদেশের
মোবারক কোন অপরাধী ছিলেন না। সেখানকার আদালতও সেটি বিবেচনায় নিয়েছে।
আদালতের কারণেই মোবারক বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরেছেন। দেখা যাচ্ছে, প্রায়শই
বাংলাদেশের কারাগারে এমনকিছু নাগরিককে পাওয়া যাচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে কোন
মামলা নেই। কিন্তু কারাবাস ভাগ্যে লেখা রয়েছে। কোন অপরাধের সম্পৃক্তারও কোন
দলিল নেই। তাহলে কেন তারা কারাগারে? বলার বা বোঝার অপেক্ষা রাখে না,
গণগ্রেফতার বলে যে বিশেষ টার্ম চালু রয়েছে তার শিকার হয়েই এসব নাগরিক
অনির্দিষ্টকাল কারাবাস করেন। যাদের কল্যাণে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিপুষ্ট
তাদের অনেকেই ভাগ্যান্বেষণে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন কারাগারে আটকা পড়ে রয়েছে।
তবে এসবের আলাদা আলাদা দিক রয়েছে। সুখরঞ্জন এদের অন্তর্ভুক্ত নন। তা
সত্ত্বেও ভারতীয় যে কারাগারে তিনি বন্দি রয়েছেন প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী,
ক’দিন আগেই বন্দি বাংলাদেশীদের দেখতে ওই কারাগারে বাংলাদেশের দায়িত্বশীলরা
গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখরঞ্জন বালি সেখানে আছেন কিনা সেটা নাকি শনাক্ত করা
সম্ভব হয়নি। রহস্যের জাল এখানেও। বোধহয় এটা বলা অন্যায় নয় যে, সংশ্লিষ্ট
কর্তারা হয়তো নিশ্চিত হতেই গিয়েছিলেন বালি আসলেই সেখানে আছে কিনা? কারণ
বালির হারিয়ে যাওয়া যতগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সেগুলোর সমাধান করা
অত্যন্ত জটিল। এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশী নাগরিক গুম হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তার
বিবরণ সকলের কাছে নেই। এ মাসেই আইন সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের চার বছরে ১৫৬ জন গুম হয়েছে। বলা হয়েছে, গুম
হওয়াদের মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেলেও অন্যদের কোন হদিস মেলেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ২০১২ সালের মানবাধিকার রিপোর্টেও বাংলাদেশের বড়
মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে জোরপূর্বক গুমের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী যেমন র্যাব ও ক্রিমিনাল
ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের মাধ্যমে গুম ও অপহরণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অধিকারের
তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ২৪টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল
৩০। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের
বার্ষিক রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে বিভীষিকাময় চিত্র তুলে
ধরা হয়েছে সরকার তা মানতে নারাজ। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী,
বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমসহ অনেককেই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ
রয়েছেন। এ মাসেই ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এক বছর কেটে
গেলেও প্রভাবশালী এই নেতার ভাগ্যে কী ঘটেছে তিনি জীবিত না মৃত সে প্রশ্নের
জবাব মেলেনি। দীর্ঘ সময়েও তার হদিস পায়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসেও স্বজনরা ফিরে পায়নি তাকে। তাকে উদ্ধারে
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কেবলমাত্র কোর্টের কাছে রুটিনমাফিক তদন্ত
রিপোর্ট জমা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত বছর মে মাসে একজন ব্রিটিশ
মন্ত্রীও বাংলাদেশ সরকারের কাছে ইলিয়াসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ
প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুরোধ
করেছিলেন। বিএনপির এই নেতাও প্রকাশ্য রাজপথ থেকে গুম হয়েছিলেন। তার গুম
হওয়ার ঘটনা যে পুলিশ কর্মকর্তা দেখেছিলো সেই মাহবুবের পরিণতিও নাকি একই
হয়েছে। অপহরণের সময় যেসব সাধারণ লোকজন দেখেছিল তাদের ভাগ্যেও নেমে এসেছে
নির্মমতা। অনুরূপভাবে প্রকাশ্য মিটিং থেকেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন চৌধুরী
আলমসহ আরো অনেকেই। আজ পর্যন্ত তাদের কোন খবর পাওয়া যায়নি। গুম হওয়া একজন
শ্রমিক নেতা ফিরে এসে যে বিবরণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি বলেছেন, তার ধারণা তাকে
যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে অনুরূপভাবে আরো অনেকে ছিল। নানা হাত ঘুরে
শেষপর্যন্ত পুলিশের গাড়িতেই তাকে নির্দিষ্ট থানায় পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। ওই
নেতাকে প্রকাশ্য রাজপথ থেকে গুম করে ফেলা হয়েছিল। আর গুম হওয়ার সাথে সাথেই
পরিবহন শ্রমিকরা রাজধানী অচল করে দিয়ে তার মুক্তি নিশ্চিত করার দাবি
করেছিল। শ্রমিক নেতার গুম থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুখরঞ্জন বালিকে খুঁজে
পাওয়ার ঘটনা থেকে প্রাসাঙ্গিক ধারণা গ্রহণ করা অমূলক নয়। গুম রহস্যের
সূত্র হয়তো এখন পুরোপুরি উৎঘাটন করা যায়নি। তবে কাছাকাছি হয়তো আসা গেছে।
এখনো পরিষ্কার হয়নি গুমের ঘটনার সাথে এক না একাধিক গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুম-অপহরণের ঘটনাকে অস্বীকার করছে আইন-শৃঙ্খলা
বাহিনী। প্রশ্ন উঠতে পারে, গুম যেহেতু বাস্তব তাহলে গুমের সাথে কারা জড়িত?
তারা কী রাষ্ট্রের নাকি অন্য কোন জায়গা থেকে আগত। এই প্রশ্ন আরো গুরুতর
আকারে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সরকারি কিছু সিদ্ধান্তের কারণে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভা-সমিতি বন্ধ করেছেন। সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা বলছেন,
এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে হয়নি। বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে সরকারি
জোটের একজন নেতা বলেছেন, আপাও জানেন না। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেছেন, কার্যত সরকারের মধ্যেই সরকার রয়েছে।
তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উপদেষ্টা-মন্ত্রীদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে
করেন, একটি ঘনিষ্ঠ মহলই সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং সেটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যখন মদীনার সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন, তখন সারাদেশে
আলেম-ওলামার ওপর পুলিশি নির্যাতন চলছে। সরকারের ভেতর সরকারের এ আলোচনা
বর্তমান আমলে নতুন নয়। বাংলাদেশের রাজধানীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে
হাওয়া হয়ে যাওয়া বালির অবস্থান কিভাবে ভারতীয় কারাগার হলো সে প্রশ্নের
উত্তরে গেলে হয়তো তার নাম এবং ধর্মই সবকিছু ছাপিয়ে অন্যকিছু উঠবে। তার চেয়ে
বড় কথা, এর মধ্য দিয়ে শত শত নিখোঁজ হওয়ার একটি সূত্রও সম্ভবত পাওয়া
যাচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষিতে সরকার ও নাগরিকদের সম্পর্কের প্রসঙ্গটি গুরুতর। সংবিধান বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্ব মূলত সরকারের কর্মকা-ের মধ্য দিয়েই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মানুষ গুম হয়ে গেলে এবং সরকার নিষ্ক্রীয় থাকলে সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকার তার সীমায় না থাকলে নাগরিকদের সীমানাও রক্ষিত থাকে না। জানমালের নিরাপত্তার যে প্রসঙ্গটি এখানে বড় হয়ে দেখা দেয়, তার সাথেই আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। বলা অন্যায় নয়, সরকারের ভেতর যদি সরকার থাকে আর সেই সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে তাহলে তো বলাই যায়, জনগণ যাদেরকে নির্বাচিত করেছে আর যারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তারা এক নয়। দেশে দেশে স্বৈরাচার-স্বৈরশাসকদের নানা প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে তবে নিজের দেশের নাগরিকদের বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর করার নজির সম্ভবত পৃথিবীতে এই প্রথম। আর সে কারণেই হয়তো অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমান প্রেক্ষিতে সরকার ও নাগরিকদের সম্পর্কের প্রসঙ্গটি গুরুতর। সংবিধান বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্ব মূলত সরকারের কর্মকা-ের মধ্য দিয়েই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মানুষ গুম হয়ে গেলে এবং সরকার নিষ্ক্রীয় থাকলে সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকার তার সীমায় না থাকলে নাগরিকদের সীমানাও রক্ষিত থাকে না। জানমালের নিরাপত্তার যে প্রসঙ্গটি এখানে বড় হয়ে দেখা দেয়, তার সাথেই আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। বলা অন্যায় নয়, সরকারের ভেতর যদি সরকার থাকে আর সেই সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে তাহলে তো বলাই যায়, জনগণ যাদেরকে নির্বাচিত করেছে আর যারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তারা এক নয়। দেশে দেশে স্বৈরাচার-স্বৈরশাসকদের নানা প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে তবে নিজের দেশের নাগরিকদের বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর করার নজির সম্ভবত পৃথিবীতে এই প্রথম। আর সে কারণেই হয়তো অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।
|
|
|
|
||
|
||
|
|
Friday, May 24, 2013
সুরা ফাতিহার বিষয়বস্তু হলো বান্দাহর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক। ব্যক্তিগত,
পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক সবখানেই
বান্দার অবস্থান কোথায় তা জানা দরকার। বান্দার ভেতর থেকেই এর জবাব পাওয়ার
চেষ্টা যদি থাকে তবে, সুরা ফাতিহা এই জিজ্ঞাসার তৃষ্ণা মেটাতে মহাসমুদ্রের
মতো তার সামনে এসে হাজির হয়।
এটি মূলত আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া একটি মানপত্র। যাতে আল্লাহর কাছে বান্দাহ তার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলছে। একটা মানপত্রের মতন এতেও তিনটি অংশ। প্রথমেই যার কাছে চাওয়া হচ্ছে তার প্রশংসা, তারপর যে বা যারা চাচ্ছে তার পরিচয়, সবশেষে বান্দাহর চাওয়া।
২.
আমরা বলি, আলহামদুলিল্লাহির রাব্বিল আলামীন। এখানে আল্লাহর প্রশংসাসূচক পরিচয়ে আমরা তাকে সম্বোধন করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আলামীনের রব। এখানে আল্লাহ, আলামীন ও রব তিনটি শব্দের গুরুত্ব বুঝলেই আল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ হলো এমন সত্তা যার উলুহিয়াত একচ্ছত্র। (উলুহিয়াত অর্থ হলো সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে এমন সত্তা)। আল ইলাহ অর্থ হলো একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ তিনিই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন। তারপর হলো রব। রাব্বুল আলামীন। অর্থ সকল জগতের রব। আলামীন অর্থ জগৎ। ডিপ সিতে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রোটোজোয়া এমিবা থাকে তার যেমন একটি জগৎ আছে, তেমনি ওই অনন্ত আলোকবর্ষ দূরের অজানা মহাশূন্যে, বড় বড় গ্যালাক্সিকে গিলে খাওয়া ব্ল্যাকহোলেরও একটা জগৎ আছে। বিচিত্র সব জগৎ : প্রাণী জগৎ, সমুদ্র জগৎ, মহাশূন্য জগৎ প্রভৃতি। বেড়ালের জগৎ, গরু-ছাগলের জগৎ, মশার জগৎ মৌমাছির জগৎ, প্রজাপতির জগৎ কিংবা ফুলের জগৎ। আবার আমাদের জীবনেও হাজারো জগৎ আছে। চিন্তার জগৎ, মনোজগৎ আরও লক্ষকোটি জগৎ। আল্লাহ, যিনি রাব্বুল আলামীন, এর অর্থ দাঁড়ায় তিনি এই সব জগতেরই পালনকর্তা। রব তাই এক অর্থে প্রতিপালক। তিনি জন্ম দিয়ে বা সৃষ্টি করেই বসে থাকেন না, তাদের চাওয়ার আগেই দরকার মতো প্রাপ্য দিয়ে দেন। যেমন বাতাস, পানি ইত্যাদি। বস্তু বা প্রাণী সবার প্রতিপালক।
বান্দাহর এতটুকু প্রশংসাতেই আল্লাহর গুণগান শেষ হয় না। তাই পরক্ষণেই বান্দাহ বলে, আররাহমানহির রাহিম। রাহমান ও রাহিম শব্দ দুটোর ভাব কাছাকাছি তবে তাৎপর্য আলাদা। আল্লাহ রাহমান অর্থাৎ দয়ালু। সেই সাথে তিনি রাহিম এর অর্থও দয়ালু। রাহমান হচ্ছেন ইহকালের জন্য। আর রাহীম হচ্ছেন পরকালের জন্য। পরের লাইনেই এই রাহিমকে ব্যালেন্স করার জন্যই আল্লাহ বান্দাহকে বলতে শেখালেন মালিকি ইয়াওমিদ্বীন। মালিক, ইয়ামুন এবং দ্বীন। তিনি বিচার দিনের মালিক। অর্থাৎ তিনি রাহিম বা দয়ালু ঠিক আছে, তবে ইনসাফ করার সময় তিনি ঠিকই সঠিক বিচার করবেন।
সুরা ফাতিহার এই পর্যন্ত হলো আল্লাহর পরিচয়। এখানে বান্দাহ কার নিকট থেকে এসেছে কিভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে এবং কোথায় যাবে তার বিষয়গুলো সুক্ষ্মভাবে লুকিয়ে আছে। সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। প্রতিপালন করছেন আল্লাহ। তারপর আবার তার নিকটই ফিরে যেতে হবে এবং প্রতিটি কাজের হিসাব তাকেই দিতে হবে।
সুরা ফাতিহার এর পরের অংশে রয়েছে বান্দাহর পরিচয়। ইয়াকানাবুদু ওয়া ইয়াকানাসতাইন। একমাত্র তোমারই ইবাদত করি আর তোমার নিকট সাহায্য চাই। অর্থাৎ বান্দাহর পরিচয় হলো, আমি আল্লাহর আবদ বা দাস। এটাই তার একমাত্র পরিচয়। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আবদ বা দাস ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। এর পূর্বেও সকল নবীগণ একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করে গেছেন। বান্দাহকে তাঁরই দাস হতে হবে। এটা হওয়া কর্তব্য। সেই সাথে সকল সাহায্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। কোনো পীর, মাজার, মন্ত্রী বা বস নেতার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। সুরা ফাতিহার এই অংশে বান্দাহ এটুকুই উপলব্ধি করে।
এক কথায় একজন মানুষ আল্লাহর দাস। সে তাঁর নিকট এটা বলে। এরপর তার চাওয়ার পালা। বান্দাহ চায়- ইহদিনাস সিরাত্বাল মুসতাকিম। আমাকে সরল সঠিক পথ দেখাও। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের আজ এটিই চাওয়া। সরল পথ চাওয়ার প্রবণতা প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সার্বজনীন চাওয়া। সেই সাথে বান্দাহর আরও চাওয়া-সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদদাল্লিন। ইনডাইরেক্টলি এই চাওয়ার ভেতরেই কিন্তু বান্দাহর পাওয়ার উত্তর আছে। সেই সব লোকের পথ যারা তোমার নিয়ামত পেয়েছে। এরা হলো চার শ্রেণী-নবী বা রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহ ব্যক্তিগণ। আবার পরক্ষণেই বলা হচ্ছে, তাদের পথ নয়, এরা হলো দুই শ্রেণী; মাগদুব এবং দুয়াল্লিন। অভিশপ্ত আর পথভ্রষ্ট। সুরা ফাতিহার এই দুইটি শ্রেণী কয়েকটি গোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করে। পথভ্রষ্ট মানে মুশরিকরা। যারা আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরিক করে। যেমন, নাসারা বা খ্রিস্টানরা আর মুশরিকরা। আবার অভিশপ্তরা হলো ইহুদী। অর্থাৎ সুরা ফাতিহার শেষ অংশে এসে আল্লাহকে বান্দাহ বলে, আমি যেন কোনোক্রমেই খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুশরিকদের পথ অনুসরণ না করি।
৩.
সুরা ফাতিহা আমার জন্য দিনে কমপক্ষে সতের বার পড়া ফরজ। এটি না পড়লে কেউ মুসলমান থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ কমপক্ষে সতের বার এটি পাঠ করছি অথচ আমার আচরণ বা চলাফেরা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিকদের মতোই যদি থেকে যায় তাহলে এই পড়ার স্বার্থকতা কোথায়?
মানুষ বেঁচে থাকে দুইটি বিষয়কে উপজীব্য করে : আমল ও আখলাখ। মারা গেলে আমল সাথে চলে যায় আর তার আখলাক বা চরিত্র দুনিয়ায় থেকে যায়। সবাই স্মরণ করে। তার চরিত্র কেমন ছিলো, লেনদেন, আচার আচরণ, চলাফেরা, পর্দা-পুশিদা কেমন ছিল ইত্যাদি নিয়েই আলোচনা হতে থাকবে। যদি আখলাক ভালো না হয় তাহলে তার মূল্য কোথায়? সঠিক আখলাকের অনুসরণ করাই সুরা ফাতিহার সিরাত্বাল মুস্তাকিম বা সরল পথ। সুরা ফাতিহার মূল বিষয়বস্তুতে এই বিষয়গুলোই স্পষ্টরূপে বার বার উদ্ভাসিত হতে থাকে।
এটি মূলত আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া একটি মানপত্র। যাতে আল্লাহর কাছে বান্দাহ তার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলছে। একটা মানপত্রের মতন এতেও তিনটি অংশ। প্রথমেই যার কাছে চাওয়া হচ্ছে তার প্রশংসা, তারপর যে বা যারা চাচ্ছে তার পরিচয়, সবশেষে বান্দাহর চাওয়া।
২.
আমরা বলি, আলহামদুলিল্লাহির রাব্বিল আলামীন। এখানে আল্লাহর প্রশংসাসূচক পরিচয়ে আমরা তাকে সম্বোধন করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আলামীনের রব। এখানে আল্লাহ, আলামীন ও রব তিনটি শব্দের গুরুত্ব বুঝলেই আল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ হলো এমন সত্তা যার উলুহিয়াত একচ্ছত্র। (উলুহিয়াত অর্থ হলো সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে এমন সত্তা)। আল ইলাহ অর্থ হলো একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ তিনিই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন। তারপর হলো রব। রাব্বুল আলামীন। অর্থ সকল জগতের রব। আলামীন অর্থ জগৎ। ডিপ সিতে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রোটোজোয়া এমিবা থাকে তার যেমন একটি জগৎ আছে, তেমনি ওই অনন্ত আলোকবর্ষ দূরের অজানা মহাশূন্যে, বড় বড় গ্যালাক্সিকে গিলে খাওয়া ব্ল্যাকহোলেরও একটা জগৎ আছে। বিচিত্র সব জগৎ : প্রাণী জগৎ, সমুদ্র জগৎ, মহাশূন্য জগৎ প্রভৃতি। বেড়ালের জগৎ, গরু-ছাগলের জগৎ, মশার জগৎ মৌমাছির জগৎ, প্রজাপতির জগৎ কিংবা ফুলের জগৎ। আবার আমাদের জীবনেও হাজারো জগৎ আছে। চিন্তার জগৎ, মনোজগৎ আরও লক্ষকোটি জগৎ। আল্লাহ, যিনি রাব্বুল আলামীন, এর অর্থ দাঁড়ায় তিনি এই সব জগতেরই পালনকর্তা। রব তাই এক অর্থে প্রতিপালক। তিনি জন্ম দিয়ে বা সৃষ্টি করেই বসে থাকেন না, তাদের চাওয়ার আগেই দরকার মতো প্রাপ্য দিয়ে দেন। যেমন বাতাস, পানি ইত্যাদি। বস্তু বা প্রাণী সবার প্রতিপালক।
বান্দাহর এতটুকু প্রশংসাতেই আল্লাহর গুণগান শেষ হয় না। তাই পরক্ষণেই বান্দাহ বলে, আররাহমানহির রাহিম। রাহমান ও রাহিম শব্দ দুটোর ভাব কাছাকাছি তবে তাৎপর্য আলাদা। আল্লাহ রাহমান অর্থাৎ দয়ালু। সেই সাথে তিনি রাহিম এর অর্থও দয়ালু। রাহমান হচ্ছেন ইহকালের জন্য। আর রাহীম হচ্ছেন পরকালের জন্য। পরের লাইনেই এই রাহিমকে ব্যালেন্স করার জন্যই আল্লাহ বান্দাহকে বলতে শেখালেন মালিকি ইয়াওমিদ্বীন। মালিক, ইয়ামুন এবং দ্বীন। তিনি বিচার দিনের মালিক। অর্থাৎ তিনি রাহিম বা দয়ালু ঠিক আছে, তবে ইনসাফ করার সময় তিনি ঠিকই সঠিক বিচার করবেন।
সুরা ফাতিহার এই পর্যন্ত হলো আল্লাহর পরিচয়। এখানে বান্দাহ কার নিকট থেকে এসেছে কিভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে এবং কোথায় যাবে তার বিষয়গুলো সুক্ষ্মভাবে লুকিয়ে আছে। সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। প্রতিপালন করছেন আল্লাহ। তারপর আবার তার নিকটই ফিরে যেতে হবে এবং প্রতিটি কাজের হিসাব তাকেই দিতে হবে।
সুরা ফাতিহার এর পরের অংশে রয়েছে বান্দাহর পরিচয়। ইয়াকানাবুদু ওয়া ইয়াকানাসতাইন। একমাত্র তোমারই ইবাদত করি আর তোমার নিকট সাহায্য চাই। অর্থাৎ বান্দাহর পরিচয় হলো, আমি আল্লাহর আবদ বা দাস। এটাই তার একমাত্র পরিচয়। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আবদ বা দাস ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। এর পূর্বেও সকল নবীগণ একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করে গেছেন। বান্দাহকে তাঁরই দাস হতে হবে। এটা হওয়া কর্তব্য। সেই সাথে সকল সাহায্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। কোনো পীর, মাজার, মন্ত্রী বা বস নেতার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। সুরা ফাতিহার এই অংশে বান্দাহ এটুকুই উপলব্ধি করে।
এক কথায় একজন মানুষ আল্লাহর দাস। সে তাঁর নিকট এটা বলে। এরপর তার চাওয়ার পালা। বান্দাহ চায়- ইহদিনাস সিরাত্বাল মুসতাকিম। আমাকে সরল সঠিক পথ দেখাও। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের আজ এটিই চাওয়া। সরল পথ চাওয়ার প্রবণতা প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সার্বজনীন চাওয়া। সেই সাথে বান্দাহর আরও চাওয়া-সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদদাল্লিন। ইনডাইরেক্টলি এই চাওয়ার ভেতরেই কিন্তু বান্দাহর পাওয়ার উত্তর আছে। সেই সব লোকের পথ যারা তোমার নিয়ামত পেয়েছে। এরা হলো চার শ্রেণী-নবী বা রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহ ব্যক্তিগণ। আবার পরক্ষণেই বলা হচ্ছে, তাদের পথ নয়, এরা হলো দুই শ্রেণী; মাগদুব এবং দুয়াল্লিন। অভিশপ্ত আর পথভ্রষ্ট। সুরা ফাতিহার এই দুইটি শ্রেণী কয়েকটি গোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করে। পথভ্রষ্ট মানে মুশরিকরা। যারা আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরিক করে। যেমন, নাসারা বা খ্রিস্টানরা আর মুশরিকরা। আবার অভিশপ্তরা হলো ইহুদী। অর্থাৎ সুরা ফাতিহার শেষ অংশে এসে আল্লাহকে বান্দাহ বলে, আমি যেন কোনোক্রমেই খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুশরিকদের পথ অনুসরণ না করি।
৩.
সুরা ফাতিহা আমার জন্য দিনে কমপক্ষে সতের বার পড়া ফরজ। এটি না পড়লে কেউ মুসলমান থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ কমপক্ষে সতের বার এটি পাঠ করছি অথচ আমার আচরণ বা চলাফেরা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিকদের মতোই যদি থেকে যায় তাহলে এই পড়ার স্বার্থকতা কোথায়?
মানুষ বেঁচে থাকে দুইটি বিষয়কে উপজীব্য করে : আমল ও আখলাখ। মারা গেলে আমল সাথে চলে যায় আর তার আখলাক বা চরিত্র দুনিয়ায় থেকে যায়। সবাই স্মরণ করে। তার চরিত্র কেমন ছিলো, লেনদেন, আচার আচরণ, চলাফেরা, পর্দা-পুশিদা কেমন ছিল ইত্যাদি নিয়েই আলোচনা হতে থাকবে। যদি আখলাক ভালো না হয় তাহলে তার মূল্য কোথায়? সঠিক আখলাকের অনুসরণ করাই সুরা ফাতিহার সিরাত্বাল মুস্তাকিম বা সরল পথ। সুরা ফাতিহার মূল বিষয়বস্তুতে এই বিষয়গুলোই স্পষ্টরূপে বার বার উদ্ভাসিত হতে থাকে।
তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়
তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে
করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:
“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।
[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।
[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।
[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।
[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
সরলপথ
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং
তাঁরই কাছে সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়াত দান করেন তাকে কেউ
পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে
পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি
একক এবং তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর: মহান আল্লাহ
সমস্ত মুমিনদেরকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তাওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।” (আননূর: ৩১)
তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও অত্যাচারী হিসেবে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
“যারা তাওবা করবে না, তারাই অত্যাচারী।” (আলহুজুরাত: ১১)
আর এখন এমন এক সময় এসেছে যাতে মানুষ আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করছে ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ থেকে কেউই বাঁচতে পারছে না আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া।
আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছা এই যে, তিনি তাঁর নূরকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন, যার ফলে অনেক লোকই তাদের গাফলতী ও তন্দ্রা থেকে জেগে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তারা আল্লাহর হকের ব্যাপারে কার্পণ্য করেছে, তার অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত, যার ফলে তারা তাওবার দিকে এগিয়ে এসেছে। অন্যরা এই বিষাক্ত জীবনের ব্যাপারে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা পথ খুঁজছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু তাদের সামনে বাধা হয়ে উঠেছে কিছু প্রতিবন্ধকতা যা তাদের মাঝে ও তাওবার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিছু হলো মনের মধ্যে, আর কিছু হলো তার চতুর্পাশে। আমি এ পুস্তিকা রচনা করেছি এ আশা করে যে, এসব বিষয় পরিষ্কার করা ও এর হুকুম স্পষ্ট করে বর্ণনা করার লক্ষ্যে এবং শয়তানকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে।
এ নিবন্ধে একটি ভূমিকা থাকবে গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা সম্পর্কে, এরপর তাওবার শর্তাবলীর ব্যাখ্যা ও তার মানসিক চিকিৎসা সম্পর্কে। এরপর থাকবে তাওবা সম্পর্কে ফাত্ওয়া, দলীল প্রমাণসহ কুরআন, হাদীস এবং আহলুল ইলমের অভিমত। পরিশেষে থাকবে একটি উপসংহার। আল্লাহর নিকট দু’আ করি, তিনি যেন আমাকে এবং আমার ভাই-বোনদেরকে এ থেকে নসিহত ও উত্তম দাওয়াত গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের সকলের তাওবা কবুল করেন।
“হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তাওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।” (আননূর: ৩১)
তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও অত্যাচারী হিসেবে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
“যারা তাওবা করবে না, তারাই অত্যাচারী।” (আলহুজুরাত: ১১)
আর এখন এমন এক সময় এসেছে যাতে মানুষ আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করছে ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ থেকে কেউই বাঁচতে পারছে না আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া।
আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছা এই যে, তিনি তাঁর নূরকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন, যার ফলে অনেক লোকই তাদের গাফলতী ও তন্দ্রা থেকে জেগে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তারা আল্লাহর হকের ব্যাপারে কার্পণ্য করেছে, তার অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত, যার ফলে তারা তাওবার দিকে এগিয়ে এসেছে। অন্যরা এই বিষাক্ত জীবনের ব্যাপারে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা পথ খুঁজছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু তাদের সামনে বাধা হয়ে উঠেছে কিছু প্রতিবন্ধকতা যা তাদের মাঝে ও তাওবার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিছু হলো মনের মধ্যে, আর কিছু হলো তার চতুর্পাশে। আমি এ পুস্তিকা রচনা করেছি এ আশা করে যে, এসব বিষয় পরিষ্কার করা ও এর হুকুম স্পষ্ট করে বর্ণনা করার লক্ষ্যে এবং শয়তানকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে।
এ নিবন্ধে একটি ভূমিকা থাকবে গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা সম্পর্কে, এরপর তাওবার শর্তাবলীর ব্যাখ্যা ও তার মানসিক চিকিৎসা সম্পর্কে। এরপর থাকবে তাওবা সম্পর্কে ফাত্ওয়া, দলীল প্রমাণসহ কুরআন, হাদীস এবং আহলুল ইলমের অভিমত। পরিশেষে থাকবে একটি উপসংহার। আল্লাহর নিকট দু’আ করি, তিনি যেন আমাকে এবং আমার ভাই-বোনদেরকে এ থেকে নসিহত ও উত্তম দাওয়াত গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের সকলের তাওবা কবুল করেন।
হাদিসের গল্প – আবূ ত্বালিবের মৃত্যুর ঘটনা
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা
মুসাইয়্যাব (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, যখন আবূ ত্বালিব মুমূর্ষু অবস্থায়
উপনীত হ’লেন, রাসূল (সাঃ) তার নিকট গেলেন।আবূ জাহলও সেখানে ছিল। নবী
(সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহ’লে আমি আপনার জন্য আল্লাহ্ নিকট কথা বলতে পারব।
তখন আবূ জাহল ও আব্দুললাহ ইবনু আবূ উমাইয়া
বলল, হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হ’তে ফিরে যাবে? এরা
দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ ত্বালিব তাদের সাথে
যে কথাটি বলল, তা হ’ল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার
পর নবী (সাঃ) বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার
ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’।এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হল
‘নবী ও
মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি
তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা
জাহান্নামী’ [সূরা তওবা - ১১৩]
আরো নাযিল হল:
‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ [ সূরা কাছাছ - ৫৬]
[ বুখারী হা/৩৮৮৪ ‘আনছারদের মর্যাদা’অধ্যায়, ‘আবু ত্বালিবের কাহিনী’অনুচেছদ ]
আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা:) হ’তে বর্ণিত যে,
তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁর সামনে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের
আলোচনা করা হ’ল, তখন তিনি বললেন, আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুফারিশ তার
উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে। যা তার পায়ের
গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছাবে আর এতে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে (ঐ, হা/৩৮৮৫)।
শিক্ষা:
১. হেদায়েতের মালিক
আল্লাহ্ তা‘আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন।
এজন্য সবসময় তার কাছে হেদায়েত চাইতে হবে।
২. জাহান্নামের আযাব
অত্যন্ত ভয়াবহ।সবচেয়ে হালকা শাস্তি হওয়ার পরেও যদি আবূ ত্বালিবের এই অবস্থা
হয়, তাহ’লে অন্যদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।
৩. সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষকে অনেক সময় হক গ্রহণ থেকে বিমুখ রাখে।
ইসলামের চোখে নান্দনিকতা ও শিল্প
বিজ্ঞানের বিকাশে কোরআন মজিদের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে শিল্পকলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে। বস্তুতপক্ষে কোরআন মজিদ মুসলমানদের শিল্পকলার চর্চায় উত্সাহিত করেছে। যেমন—সুন্দর সহিহভাবে কোরআন তেলাওয়াত থেকেই সুললিত উচ্চারণের একটি শাখার উদ্ভব হয়েছে। আবার কোরআন সংরক্ষণ প্রচেষ্টা থেকেই ক্যালিগ্রাফি বা সুন্দর হস্তলিখন এবং বাঁধাই শিল্পের সূত্রপাত ঘটেছে। মসজিদ নির্মাণশৈলী থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য এবং অলঙ্করণ শিল্পের।
এক সময় ধর্মীয় অনুভূতি ও উপলব্ধি থেকে যে শিল্পের উদ্ভব ঘটে, পরবর্তী সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিলাসিতা সে শিল্পকলাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে ইসলাম আত্মিক ও পার্থিব চাহিদার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করার নীতি শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সব বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার। অর্থাত্ ইসলামের হুকুম এই যে, মানুষের স্বভাবজাত প্রতিভার অবশ্যই বিকাশ ঘটাতে হবে। তবে তা হতে হবে সঠিক এবং আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে। তাকে গড়ে উঠতে হবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন (মুসলিম ও মাসনদ-ই-ইবনে হাম্বল)। অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। এমনকি তুমি যদি কাউকে হত্যা কর, তাহলে সে কাজটিও করতে হবে সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে।’ কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা (৬:৫), পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি... (১৮:৬)।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) একদিন একটি কবরস্থান দেখতে পেলেন; কিন্তু কবরস্থানটি পুরোপুরি সমান ছিল না। তখনই কবরস্থানটি সংস্কার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, কবরস্থানটি সংস্কার করার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মঙ্গল অমঙ্গলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমাদের চোখে এটা দেখতে ভালো লাগে। আল্লাহ এটা পছন্দ করেন যে, আমরা যখন কোনো কাজ করব, তখন তা অবশ্যই যথাসম্ভব সুন্দরভাবে করব। (ইবনে সা’দ)
ললিতকলার প্রতি মানুষের একটি স্বভাবজাত আকর্ষণ রয়েছে। আল্লাহ তায়াল অফুরন্ত প্রাকৃতিক নিয়ামতের মতো শিল্পকলা সম্পর্কিত প্রতিভাও একটা নিয়ামত। শিল্পকলা মানুষের জীবনাচরণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক, ইসলামে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই। এমনকি সংযমের নামে মাত্রাতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈরাগ্য ইসলামে নেই।
নবী করিম (সা.)-এর জন্য সর্বপ্রথম যে মিম্বরটি তৈরি করা হয়েছিল, তাও দুটি গোলক বা গোলাকার বস্তু দ্বারা সাজানো হয়েছিল। গোলক দুটি ছিল অনেকটা ডালিমের মতো। নবী করিম (সা.)-এর দুই প্রিয় নাতি এ গোলক দুটি দিয়ে বেশ মজা করে খেলতেন। এখান থেকেই কাঠের কারুকাজের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীকালে কোরআন মজিদের কপিগুলো নানা রঙে সুশোভিত করা হয় এবং সেগুলো বাঁধাইয়ে দারুণ যত্ন নেয়া হয়।
সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, শিল্পকলার বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না। বাধা-নিষেধ আরোপ করে থাকে শুধু প্রাণীর প্রতিকৃতি চিত্রায়ন বা নির্মাণের ক্ষেত্রে। এর পেছনেও কতগুলো যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। কারণগুলো প্রধানত মনোজগত্, সামাজিক, জীববিদ্যা ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্পর্কিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মূর্তিমান শিল্পের ব্যাপারে ইসলামে যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা কখনো মুসলমানদের শিল্পচর্চাকে ব্যাহত করতে পারেনি; বরং তাদের হাতে বিমূর্ত শিল্পচর্চার যে বিকাশ ঘটেছে তা খুবই বিস্ময়কর। কোরআন মজিদে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাজসজ্জার অনুমোদন রয়েছে (সূরা নূর : ৩৬)। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মদিনার মসজিদে নব্বী, জেরুজালেমের মসজিদ, ইস্তাম্বুলের সোলায়মানিয়া মসজিদ, আগ্রার তাজমহল, গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ এবং এ ধরনের আরো কতগুলো কীর্তির উল্লেখ করা যেতে পারে। অন্য যে কোনো সভ্যতার অসামান্য স্থাপত্যকর্ম বা শিল্প সৌকর্যের চেয়ে এগুলোকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
মুসলমানরা ছবি আঁকার পরিবর্তে ক্যালিগ্রাফিকে গ্রহণ করেছে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে। বলতে গেলে এটি তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। তারা প্রধানত অঙ্কন, কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য চিত্রায়নের কাজে ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে থাকে। যেসব ক্যালিগ্রাফি দরদ, যত্ন ও নৈপুণ্যের সঙ্গে প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর মান খুবই উন্নত। দেখতেও চমত্কার এবং মনোমুগ্ধকর। এগুলোর সৌন্দর্য সত্যিই অবর্ণনীয়।
কোরআন তেলাওয়াত মুসলমানদের শিল্পচর্চার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কোরআন তেলাওয়াতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অবকাশ নেই। কোরআনের সব আয়াতও সমান ও একই মাত্রার নয়। নবী করিম (সা.)-এর কাল থেকেই মুসলমানরা পরম আগ্রহের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে আসছেন। কোরআন মজিদে নিজস্ব একটি গতি ও ছন্দ আছে। এর আয়াতগুলো খুবই শ্রুতিমধুর ও মিষ্টি। অন্য যে কোনো ভাষার গতি ও ছন্দের মান যত উন্নত ও চিত্তাকর্ষকই হোক না কেন, তা কখনো কোরআন মজিদের মিষ্টি মধুর ম্লান করতে পারে না। যারা কস্ফারী সাহেবের তেলাওয়াত অথবা প্রতিনিয়ত মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শোনেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, এটা মুসলমানদের একটা অনন্য সম্পদ। এর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যই আলাদা। এর সঙ্গে এমন একটা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ মিশে আছে, যার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
কবিতা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, এমন কিছু কবিতা আছে যেগুলো জ্ঞানের গভীরতায় পরিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো বক্তার বক্তব্যের কার্যকারিতা একেবারেই চিত্তাকর্ষক। কোরআনুল করিমে নৈতিকতাবিরোধী কবিতাকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। কোরআনুল করিমের এই বিধানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নবী করিম (সা.) তদানীন্তন কবিদের সঠিক পথনির্দেশ দিয়েছেন। তাদের জানিয়ে দিয়েছেন তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। বলে রাখা আবশ্যক, সে আমলের শ্রেষ্ঠতম কবিরা নিয়মিত তার দরবারে আসতেন। তারা সহজেই ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারতেন। তাদের মেধাও তারা ব্যবহার করতেন যথাযোগ্যভাবে।
সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যায়, শিল্পকলার বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুন নতুন এমন অনেক বিষয় উদ্ভাবন করেন যা ছিল মানুষের চিন্তার বাইরে। অথচ এক্ষেত্রে তারা চমত্কার রুচির পরিচয় দেন এবং ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে সযত্নে পরিহার করেন। এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে :
প্রথমত অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনায়াসেই মুসলমানরা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এ অবস্থায় মুসলমানদের যদি নিজস্ব কোনো শিল্প-সংস্কৃতি না থাকত, নবী করিম (সা.) যদি মুসলমানদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতিবোধকে উজ্জীবিত না করতেন, তাহলে সহজেই তারা অমুসলমানদের সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। প্রত্যেকেই মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা করত। মুসলমানদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরত নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ফলে মুসলমানদের কখনো অন্যেরটা গ্রহণ করতে হতো না। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা তাদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলে এবং তারা এটা করে থাকে বিজ্ঞানের বিকাশ তথা মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে।
অনুবাদ : মুহাম্মদ লুত্ফুল হক
এক সময় ধর্মীয় অনুভূতি ও উপলব্ধি থেকে যে শিল্পের উদ্ভব ঘটে, পরবর্তী সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিলাসিতা সে শিল্পকলাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে ইসলাম আত্মিক ও পার্থিব চাহিদার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করার নীতি শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সব বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার। অর্থাত্ ইসলামের হুকুম এই যে, মানুষের স্বভাবজাত প্রতিভার অবশ্যই বিকাশ ঘটাতে হবে। তবে তা হতে হবে সঠিক এবং আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে। তাকে গড়ে উঠতে হবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন (মুসলিম ও মাসনদ-ই-ইবনে হাম্বল)। অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। এমনকি তুমি যদি কাউকে হত্যা কর, তাহলে সে কাজটিও করতে হবে সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে।’ কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা (৬:৫), পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি... (১৮:৬)।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) একদিন একটি কবরস্থান দেখতে পেলেন; কিন্তু কবরস্থানটি পুরোপুরি সমান ছিল না। তখনই কবরস্থানটি সংস্কার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, কবরস্থানটি সংস্কার করার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মঙ্গল অমঙ্গলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমাদের চোখে এটা দেখতে ভালো লাগে। আল্লাহ এটা পছন্দ করেন যে, আমরা যখন কোনো কাজ করব, তখন তা অবশ্যই যথাসম্ভব সুন্দরভাবে করব। (ইবনে সা’দ)
ললিতকলার প্রতি মানুষের একটি স্বভাবজাত আকর্ষণ রয়েছে। আল্লাহ তায়াল অফুরন্ত প্রাকৃতিক নিয়ামতের মতো শিল্পকলা সম্পর্কিত প্রতিভাও একটা নিয়ামত। শিল্পকলা মানুষের জীবনাচরণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক, ইসলামে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই। এমনকি সংযমের নামে মাত্রাতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈরাগ্য ইসলামে নেই।
নবী করিম (সা.)-এর জন্য সর্বপ্রথম যে মিম্বরটি তৈরি করা হয়েছিল, তাও দুটি গোলক বা গোলাকার বস্তু দ্বারা সাজানো হয়েছিল। গোলক দুটি ছিল অনেকটা ডালিমের মতো। নবী করিম (সা.)-এর দুই প্রিয় নাতি এ গোলক দুটি দিয়ে বেশ মজা করে খেলতেন। এখান থেকেই কাঠের কারুকাজের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীকালে কোরআন মজিদের কপিগুলো নানা রঙে সুশোভিত করা হয় এবং সেগুলো বাঁধাইয়ে দারুণ যত্ন নেয়া হয়।
সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, শিল্পকলার বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না। বাধা-নিষেধ আরোপ করে থাকে শুধু প্রাণীর প্রতিকৃতি চিত্রায়ন বা নির্মাণের ক্ষেত্রে। এর পেছনেও কতগুলো যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। কারণগুলো প্রধানত মনোজগত্, সামাজিক, জীববিদ্যা ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্পর্কিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মূর্তিমান শিল্পের ব্যাপারে ইসলামে যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা কখনো মুসলমানদের শিল্পচর্চাকে ব্যাহত করতে পারেনি; বরং তাদের হাতে বিমূর্ত শিল্পচর্চার যে বিকাশ ঘটেছে তা খুবই বিস্ময়কর। কোরআন মজিদে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাজসজ্জার অনুমোদন রয়েছে (সূরা নূর : ৩৬)। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মদিনার মসজিদে নব্বী, জেরুজালেমের মসজিদ, ইস্তাম্বুলের সোলায়মানিয়া মসজিদ, আগ্রার তাজমহল, গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ এবং এ ধরনের আরো কতগুলো কীর্তির উল্লেখ করা যেতে পারে। অন্য যে কোনো সভ্যতার অসামান্য স্থাপত্যকর্ম বা শিল্প সৌকর্যের চেয়ে এগুলোকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
মুসলমানরা ছবি আঁকার পরিবর্তে ক্যালিগ্রাফিকে গ্রহণ করেছে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে। বলতে গেলে এটি তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। তারা প্রধানত অঙ্কন, কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য চিত্রায়নের কাজে ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে থাকে। যেসব ক্যালিগ্রাফি দরদ, যত্ন ও নৈপুণ্যের সঙ্গে প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর মান খুবই উন্নত। দেখতেও চমত্কার এবং মনোমুগ্ধকর। এগুলোর সৌন্দর্য সত্যিই অবর্ণনীয়।
কোরআন তেলাওয়াত মুসলমানদের শিল্পচর্চার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কোরআন তেলাওয়াতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অবকাশ নেই। কোরআনের সব আয়াতও সমান ও একই মাত্রার নয়। নবী করিম (সা.)-এর কাল থেকেই মুসলমানরা পরম আগ্রহের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে আসছেন। কোরআন মজিদে নিজস্ব একটি গতি ও ছন্দ আছে। এর আয়াতগুলো খুবই শ্রুতিমধুর ও মিষ্টি। অন্য যে কোনো ভাষার গতি ও ছন্দের মান যত উন্নত ও চিত্তাকর্ষকই হোক না কেন, তা কখনো কোরআন মজিদের মিষ্টি মধুর ম্লান করতে পারে না। যারা কস্ফারী সাহেবের তেলাওয়াত অথবা প্রতিনিয়ত মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শোনেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, এটা মুসলমানদের একটা অনন্য সম্পদ। এর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যই আলাদা। এর সঙ্গে এমন একটা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ মিশে আছে, যার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
কবিতা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, এমন কিছু কবিতা আছে যেগুলো জ্ঞানের গভীরতায় পরিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো বক্তার বক্তব্যের কার্যকারিতা একেবারেই চিত্তাকর্ষক। কোরআনুল করিমে নৈতিকতাবিরোধী কবিতাকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। কোরআনুল করিমের এই বিধানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নবী করিম (সা.) তদানীন্তন কবিদের সঠিক পথনির্দেশ দিয়েছেন। তাদের জানিয়ে দিয়েছেন তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। বলে রাখা আবশ্যক, সে আমলের শ্রেষ্ঠতম কবিরা নিয়মিত তার দরবারে আসতেন। তারা সহজেই ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারতেন। তাদের মেধাও তারা ব্যবহার করতেন যথাযোগ্যভাবে।
সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যায়, শিল্পকলার বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুন নতুন এমন অনেক বিষয় উদ্ভাবন করেন যা ছিল মানুষের চিন্তার বাইরে। অথচ এক্ষেত্রে তারা চমত্কার রুচির পরিচয় দেন এবং ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে সযত্নে পরিহার করেন। এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে :
প্রথমত অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনায়াসেই মুসলমানরা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এ অবস্থায় মুসলমানদের যদি নিজস্ব কোনো শিল্প-সংস্কৃতি না থাকত, নবী করিম (সা.) যদি মুসলমানদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতিবোধকে উজ্জীবিত না করতেন, তাহলে সহজেই তারা অমুসলমানদের সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। প্রত্যেকেই মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা করত। মুসলমানদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরত নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ফলে মুসলমানদের কখনো অন্যেরটা গ্রহণ করতে হতো না। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা তাদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলে এবং তারা এটা করে থাকে বিজ্ঞানের বিকাশ তথা মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে।
অনুবাদ : মুহাম্মদ লুত্ফুল হক
Thursday, May 23, 2013
বাগিচায় বুলবুলি তুই….
ম ন সু র আ হ ম দ
তারিখ: 24 May, 2013
স্নেহধন্যা বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা এক চিঠিতে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা-কুসুম-ফোটা বসন্তই পাখিকে গান গাওয়ায়, ফল পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়।’ প্রকৃতির আহ্বানে পাখির কণ্ঠে যেমন গান ভেসে ওঠে মানুষের কণ্ঠেও তেমনি প্রকৃতি গান জাগিয়ে তোলে। তফাৎ এতটুকু যে, পাখির গানে কোনো বৈচিত্র্য নেই কিন্তু মানুষের গানের পেছনে কবির দৃশ্য-অন্তর্দৃশ্য কল্পনা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি সম্বন্ধে কল্পনা কাজ করে বলে তাতে যেমন ভাবের জোয়ার-ভাটা আছে, তেমনি আছে বৈচিত্র্যে ভরপুর সুরব্যঞ্জনা।
কবির বিভিন্ন কল্পনা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন উপমা প্রয়োগের মাধ্যমে। দেশে দেশে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকেরা তাদের শিল্পকর্মকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন উপমা প্রয়োগ করে। নজরুলের গানে উপমা প্রয়োগে কবি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এসব উপমায় প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে অতিপ্রাকৃতিক উপাদান সংমিশ্রিত হয়ে গানকে অধিকতর সৌন্দর্যাভিসারী ও হৃদয়গ্রাহী করেছে। যেমন কবির বিখ্যাত গান :
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল।
আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিভোল ॥
কবে সে ফুল-কুমারী ঘোমটা চিরে আসবে বাহিরে,
শিশিরের স্পর্শ সুখে ভাঙবে রে ঘুম রাঙবে রে কপোল ॥
এখানে ফুল-কুমারী, ফুলকলি প্রতীক ও উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু উপমেয় ঘোমটার আড়ালেই রয়ে গেছে।
নদীর জল যেমন সাগরমুখী হয়ে সাগর জলে স্বচ্ছ হয়, তেমনি কবির কণ্ঠে সুর সমন্বয় সঙ্গীত নানা উপমা নিয়ে ইসলামি স্রোতধারায় মিশে তাঁর গানকে স্ফটিক স্বচ্ছ ও মূল্যবান করেছে। যেমন একটি গানে কবি বলেছেন,
মোর অন্তরেরই হেরা গুহায়
আজও তোমার ডাক শোনা যায়
জাগে আমার প্রেমের কাবা ঘরে
তোমারি সুরত ॥
কবি এখানে তাঁর অন্তরকে রূপকধর্মী উপমারূপে হেরাগুহা ও কাবাঘরকে বেছে নিয়েছেন। নজরুলের হৃদয়ে কাবা পাকাপোক্তভাবে আসন করে নিয়ে ছিল বলে বারবার তাঁর কবিতা-গানে বিভিন্নরূপে কাবা এসেছে। তিনি গেয়েছেন,
বক্ষে আমার কাবার ছবি
চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।
কাবার জিয়ারতে তুমি কে যাও মদিনায়
আমার সালাম পৌঁছে দিও নবীজীর রওজায়।
দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে।
বেহোঁশ হয়ে চলছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে
উৎপীড়িতের লোনা আঁসু জলে ডুবে গেল কত কাবা
কত উজ তাতে ডুবে মল হায় কত নুহ হল তাবা।
আজ কি আবার কাবার পথে
ভিড় জমেছে প্রভাত হতে।
বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে কবি উপমা ব্যবহার করে তাঁর গানকে সুন্দর ও মূল্যবান করেছেন। যেমন তিনি মা আমেনার কোলের উপমা হিসেবে ঊষার কোলকে গ্রহণ করেছেন। একটি গজলে তিনি গেয়েছেনÑ
তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।
মহানবীর আবির্ভাবে মরুপ্রান্তরে যে আনন্দের বান বয়েছিল, তা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের উপমা হাজির করেছেন তাঁর গানে। যেমনÑ
লু হাওয়া বাজায় সারেঙ্গী বীণ
খেজুর পাতার তারে
বালুর আবীর ছুড়ে ছুড়ে মারে
স্বর্গে গগন পারে।
কবি কখনো নবীর উপমা খুঁজেছেন রবির মাঝে। যেমনÑ
পুরাতন রবি উঠিল না আর
সেদিন লজ্জা পেয়ে
নবীন রবির আলোকে সেদিন
বিশ্ব উঠিল ছেয়ে।
আবার কখনো কবি রসূলের উপমা করেছেন চাঁদের সনে। যেমনÑ
নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া
কে এলো মক্কায় আমেনার কোলে
ফাগুন-পূর্ণিমা-নিশিতে যেমন
আসমানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে॥
তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।
হজরতের তিরোভাবে শোকবিহ্বল বিশ্বপ্রকৃতির বেদনাকাতর রূপ কবি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উপমা হিসেবে মরুভূমির কান্নাকে ব্যবহার করে। যেমনÑ
আকাশে ললাট হানি কাঁদিছে মরুভূমি।
আকাশ সম্পৃক্ত আর একটি উপমা এসেছে কানন বালা দেবীর কণ্ঠে গীত ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’ নজরুলের বিখ্যাত গানে। কবি মেঘের উপমা দিয়েছেন পাহাড়ের সাথে। কবি কুরআন থেকে আকাশে হেলান দিয়ে পাড় ঘুমাবার উপমা গ্রহণ করেছেন কি না, জানি না। তবে কুরআনের উপমার সাথে এ উপমার মিল দেখে বুঝতে বাকি থাকে না যে, নজরুলের অন্তরতলে কুরআনের ভাবের ফল্গুধারা বয়ে ছিল। এ সব গান যে স্বর্গীয় ভাবদ্যোতক তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
কবি সুফি তত্ত্বের গভীর ভাব প্রকাশে ‘অম্বর’ ও ‘ফেরদৌস’কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। যেমনÑ
নামে যার এত মধু ঝরে, তার রূপ কত মধুময়।
কোটি তারকার কীলক রুদ্ধ অম্বর দ্বার খুলে
মনে হয় তার স্বর্ণ-জ্যোতি দুলে ওঠে কুতুহলে।
ঘুম নাহি আসা নিঝ্ঝুম নিশি- পবনের নিঃশ্বাসে
ফিরদৌস আলা হতে যেন লালা ফুলের সুরভি আসে।
কবি আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে যেসব গান রচনা করেছেন তাতে রয়েছে প্রচুর উপমা। এ ধরনের একটি গানÑ
সকাল সাঝে প্রভু সকল কাজে
বেজে উঠুক তোমারই নাম।
নিশীথ রাতের তারার মত
বেজে উঠুক তোমারই নাম ॥
এই একটি গানে রয়েছে সাতটি পূর্ণোপমা। নজরুলের সব গানে উপমার এমন প্রাচুর্য নেই বটে, তবে তাঁর শতকরা পঁচাব্বইটি গানেই উপমা বিদ্যমান, যে কারণে নজরুলের গীতিকে বলা হয়ে থাকে পূর্ণোপমা-প্রধান গীতিকা।
দুঃসহ দারুণ দিনে কবির হৃদয়ে যে হাহাকার জাগে তা যেন মরু সাহারার প্রবল তাপে উত্তপ্ত। কবির এ উপমা খুবই ব্যঞ্জনাময়।
দুর্দিনের এই দারুণ দিনে
শরণ নিলাম পানশালায়,
হায় সাহারার প্রখর তাপে
পরাণ কাঁপে দিল কাবাব ॥
আবার এক অতুলনীয় কল্পনাবিলাসে কবি তাঁর প্রিয়তমাকে সাজাতে আসমানের চাঁদ তারা রং ধনু জেওরের উপমারূপে গানে সাজিয়েছেন। যেমনÑ
মোর প্রিয়া হবে, এস রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।
জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায়,
রামধনু হতে লাল রং ছানি’ আলতা পরাব পায়।
নজরুল তাঁর জৈব ভাবদোতক পার্থিব ভালোবাসার গানে রূপক উপমা এমনভাবে গ্রহণ করছেন যা শ্রোতাকে মুহূর্তে স্বর্গে মর্তে বিচরণ করিয়ে আনে। যেমনÑ
‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে’, ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে’ ইত্যাদি গান। এসব গান কামনা-বাসনার রূপায়ণমূলক রচনা হলেও এসবের মধ্যে এমন সূক্ষ্মতা আছে যার আবেদন কাব্যভাবগ্রাহীর কাছেই শুধু অমূল্য সম্পদরূপে ধরা দেয়। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে একটি গানের কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো যেন তারা তাতে রূপক উপমার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এ উদ্ধৃতিতে শুধু কথার সৌন্দর্যই ধরতে পারা যাবে, সুরের সৌন্দর্য নয়, যেমনÑ
‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে।
জানিতে নাইকো বাকী সই ও আঁখি কী যাদু জানে।
একে ঐ চাউনি বাঁকা সুর্মা আঁকা তায় ডাগর আঁখি,
বাঁধতে তায় কেন সাধ, যে মেরেছে ঐ আঁখি বাণে?
কাননে হরিণ কাঁদে সলিল ফাঁদে ঝুরছে শফরি,
বাঁকায় ভূরুর ধনু ফুল অতনু-কুসুম শর হানে।’
এ গানটিতে এক প্রেমিকের প্রেমতপ্ত হৃদয়ের হতাশা মথিত কাতরোক্তি রূপক ও উপমার জাদুতে অনবদ্য ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। এভাবে নজরুলের হাজার হাজার গানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অনুপম উপমা। আমার মনে হয় উপমা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নজরুল সব কবিকে পেছনে ফেলেছেন। বাণীর ক্ষেত্রেও একথা সত্য!
Subscribe to:
Posts (Atom)