Saturday, November 27, 2021

 

রাসূল (স)- এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা 

রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি মেধা ও যােগ্যতার দিক দিয়ে সকলের চেয়েও উন্নত ছিলেন। তিনি ছিলেন বীরত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা ও বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে অদ্বিতীয় ব্যক্তিসত্তা। নবী-রাসুলগণ মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার দিক-নির্দেশনা লাভ করে থাকেন। তাদের জ্ঞান ও চিন্তা-ভাবনা গােটা  পৃথিবীর সকল ব্যক্তিত্বের উর্ধ্বে হয়ে থাকে। এরূপভাবে আমাদের নবী করীম (স) -এর জ্ঞানও সারা বিশ্ববাসীর মধ্যে সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ। আল্লামা মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আসসালিহী তার রচিত 'সুবুলুল হুদা" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যদি জ্ঞানের একশত অংশ ধারণা করা যায় তাহলে তার মধ্যে ৯৯ ভাগ আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে প্রদান করেছেন এবং এক অংশকে সারা পৃথিবীবাসীকে দিয়েছেন। (সুবুলুল হুদা, খ-৭, পৃ. ১১ মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালেহী) এ কথার আলােকে বিভিন্ন স্তরের মেধাবী লােকদের কার্যাবলি এবং সার্বিক হিসাব গ্রহণ করলে মানব ইতিহাসের জ্ঞান আহরণকারী কার্যাবলি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি উদঘাটন, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার ব্যাপারে অভিজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গির হিসাব গ্রহণ করে আজকের মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়। যেহেতু এ সব মানুষের জ্ঞানের পরিমাণ একশত ভাগের এক ভাগের চাইতেও কম তাহলে রাসূল (স)-এর জ্ঞানকে  কীভাবে আন্দাজ করা যাবে যার একার জ্ঞানের ভাগ হলো ৯৯( নিরানব্বই)? খ্যাতনামা আলেম শাহ আল আযহারী (রহ) 'দ্বিয়াউন নবীতে উল্লেখ করেছেন, নবী করীম (স)-এর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এর চেয়ে বড় আর কোনাে প্রমাণের প্রয়ােজন নাই। কারণ, নবীদের সরদার স্বীয় বিজ্ঞতার দ্বারা সকল প্রকারের লোেকদের ইসলামের ছাঁচে এভাবে ঢেলে সাজিয়েছিলেন যে, তার মেজাজ ও ফিতরাত (প্রকৃতি) পরিবর্তন করে রেখে দেবেন। (দ্বিয়াউন নবী (স) খ-৫, পৃ. ২৭১ মুহাম্মদ করম শাহ, প্রকাশক দ্বিয়াউল কুরআন পাবলিকেশনস, লাহাের।) কাজীউল কুযাত (বিচারকদের বিচারক) কাজী ইয়াজ রহমাতুল্লাহ কিতাবুশ শিফা বি তারীফী হুকুমিল মুস্তফা’তে লিখেছেনএতে কোনাে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, হুজুর (স) সকল মানুষের চাইতে অধিক জ্ঞানী ও ধীশক্তিসম্পন্ন এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। দুনিয়ার কোনাে ব্যক্তির নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেননি। অতীতের কোনাে বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্টও ছিলেন না, কোনাে কিতাবও অধ্যয়ন করেননি। তারপর কীভাবে তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাগর প্রবাহিত করে ছাড়লেন । আহকামে শরিয়তকে কীভাবে আন্দাজে পেশ করলেন, কেনােইবা শােনার সাথে সাথে শ্রোতার মেজাজ তা না মেনে উপায় থাকল না। এসব বক্তব্যের ওপর দৃষ্টি দেয়ার পর একজন জ্ঞানবান ব্যক্তি অবশ্যই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, সর্বশেষ নবী জ্ঞান-বুদ্ধিতে সকলের চেয়ে অগ্রগণ্য এবং এ সিদ্ধান্তে | পেীছাবে যে, এ পন্থার মধ্যে কোনােরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। (কিতাবুশ শিফা বিতারীফী হুকুকিল মুস্তফা, খ-১২, পৃ. ১২৯, ১৩০, কাজী ইয়াজ আন্দালুসী)

সীরাতে ইবনে হিসাবে নবী করীম (স)-এর জীবনের একটি ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে যার মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, হুজুর (স) ওই অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেও অতুলনীয় চৌকস জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কাবা শরীফের নির্মাণ কাজে মক্কার কুরাইশগণ যখন প্রত্যেক গােত্র পৃথক পৃথক পাথর সংগ্রহ করতে শুরু করল এবং ইমারত তৈরি করতে মশগুল রইল, এবং এ বিল্ডিং রুকন পর্যন্ত পৌছাল, তখন প্রত্যেক গােত্র চাইলো যে তারা তা পূর্ণ করবে। এ বিষয়ে কথাবার্তা এমন পর্যায়ে গিয়ে পেীছল যে, যা হত্যাযজ্ঞঃ পর্যন্ত যাবে। প্রত্যেক গােত্র একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। বনু আব্দুদদার এক পেয়ালা রক্ত ভরে রাখলাে এবং তাদের সব সঙ্গীদের হাত এ রক্তে চুবিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো । রক্তের মধ্যে হাত ঢুকানাের অর্থ এই ছিল যে, আমরা জীবন দিব কিন্তু পিছু হটবে না। এ ধরনের উত্তেজনার মধ্যে চার-পাঁচ রাত অতিক্রম হলাে এবং কোনােভাবে এ বিষয়ের কোনাে সমাধান হলাে না। অবশেষে কুরাইশ সম্প্রদায়া মসজিদে হারামে সমবেত হয়ে পরামর্শ করতে থাকে কী করা যায়? কুরাইশদের সবচেয়ে বয়স্ক বুর্গ আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরা বিন আব্দুল্লাহ বিন ওমর বিন মাখযুম বললেন, হে কুরাইশগণ! তােমরা এক কাজ করােতোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পাওয়া দিয়ে প্রথমে মসজিদে আসবে তার ফায়সালা মেনে নাও। ইবনে সায়াদ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সকলে মিলেই সিদ্ধান্ত নেন; পরদিন যে ব্যক্তি প্রথমে আসবে আমরা তার ফায়সালা মেনে নিব । এ সময় হযরত মুহাম্মদ (স) সেখানে তাশরীফ রাখেন। সব লোক তাকে দেখে খুবই খুশি হন এবং বলতে থাকেন, অশাই ইনি আল-আমিন। তিনি যে ফয়সালা করবেন আমরা খুশি মনে তা মেনে নেবাে। যখন হুজুর (স) পৌছালেন তখন সবাই বললেন, আমরা আপনার ফায়সালা মেনে নিচ্ছি, আপনি ফায়সালা করে দিন। হুজুর (স) বর্ণনা করেন ; আমার নিকট এক খণ্ড কাপড় নিয়ে আসে। লােকেরা কাপড় নিয়ে আসলে রাসূল (স) নিজে কাপড়ের ওপর হাজরে আসওয়াদ রেখে ঘােষণা করেন, তােমরা সব লােক সব গােত্র থেকে এই কাপড় ধর এবং একে উঠিয়ে দেওয়ালের পাশে নাও। যখন সৰ গােত্রের লােকেরা এই কাপড় (যার মধ্যে হাজরে আসওয়াদ ছিল) নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত নিয়ে আসে তখন তিনি স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ওটাকে উঠিয়ে দেওয়ালে রেখে দেন। এভাবে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায় এবং এর ওপর ভবন হতে থাকে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, খ-১, পৃ.-১২৭, তৰাকাতে ইবন সাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-২২৫, তারীখে তাবারী, খ-১, পৃ.-৬৮) এভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই প্রজ্ঞা ও বীরত্ব যুদ্ধের ওপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ গোত্রগুলােকে রক্তপাত থেকে হিফাজত করল। এ ঘটনা থেকে একথা প্ৰশ পায়। যে, রাসূল (স)-কে সালিশ বানানাের সময় সবাই আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ তার প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির ওপরে সকলের পূর্ণ নির্ভরতা ছিল। তারা জানতেন যে, তিনি সবচেয়ে মেধাশক্তিসম্পন্ন। তিনি এমন কোনাে পন্থা অবশ্যই বের করবেন যার ওপর প্রতিটি গোত্র ঐকমত পােষণ করবে। নবী করীম (স)-এর জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পর্কে আল্লামা যাইনী দিহলান আসসীরাতুন নব্বীয়াহ'তে লিখেছেন- 'আল্লাহ তাআলা স্বীয় হাবীব নবী (স)-কে সব সৃষ্টির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিষয়ের ওপর সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যাতে মহানবী (স) অবস্থার সংশােধন করতে পারেন এবং উত্তম অবস্থাগুলাের দিকে লােকদেরকে দিকনির্দেশনা দানে সক্ষম হন। আল্লাহ তাআলা নবী করীম (স)-কে তার সকল বান্দার প্রতি প্রেরণ করেছিলেন, তিনি যাতে সকলকে আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান আনার জন্য দাওয়াত দিতে পারেন। আর এ কাজ যত সময় পর্যন্ত পরিপূর্ণ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিষয়াবলির সংশােধন না করেন এবং এ কথার পরিধি অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়াবলিজানার ওপর নির্ভর করে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী (স)-কে দূৱদৃষ্টিসম্পন্ন করে তৈরি করেছিলেন। হুজুর (স) সৃষ্টির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ সামষ্টিক অবস্থার বিশ্লেষণ করতেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন, যার মাধ্যমে তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থার দাবি পূর্ণ হত। (সীরাতে নাইয়াহ, খ-৩, পৃ. ২৩, আহমদ ইবনে যাইনী দিহান। দ্বিয়াউন নবী করীম (স) খ-৫, পৃ. -২৭২)। কাজীউল কুযাত আল্লামা কাজী ইয়াজ (র) রাসূল (স) -এর জ্ঞানগত মর্যাদা নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন

أن النبى صلى الله عليه وسلم أرجع التاس عقلا وافضلهم رابا .

অর্থ ও নিশ্চয়ই নবী করীম (স)-এর জ্ঞান ও প্রজ্জা সব লােকের চাইতে উত্তম ছিল। সব বিষয়ে হুজুর (স)-এর মত সকল লােকের থেকে উত্তম ছিল। (কিতাবুল শিফা বিতারীফি হুকুকিল মুস্তফা, খ-১, পৃ.-৮২ কাজী ইয়াজ আন্দালুসী।) ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রা) থেকে বর্ণিত, মানব সভ্যতার শুরু থেকে কিয়ামত হওয়া পর্যন্ত আহ্বাহ তাআলা সকল মানুষকে যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন, ঐ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নবী করীম (স)-এর মুকাবিলায় এতটুকু কণাও নয় দুনিয়ার সব মরুভূমির কণার তুলনায় যা হয়। (দ্বিয়াউন নবী (স) খ-৫, পৃ. ২৭৩, পীর মুহাম্মদ করম শাহ, দ্বিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স, লাহাের)

রাণী প্রাচ্যবিদও এ কথা স্বীকার করেছেন যে, রাসূল (স) জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে অত্যন্ত পরিপূর্ণ ছিলেন। তিনি লিখেছেন : রাসূলুল্লাহ (স) তিনি তাে সম্পূর্ণ নিৰক্ষৰ (যিনি কোনাে শিক্ষকের নিকট পড়েননি) ছিলেন, অথচ জান ও মতামতের দিক থেকে সকলের থেকে ধীশক্তিসম্পন্ন ছিলেন। (আরবের ইতিহাস শ, ১০৩, মসিয়ে সিদিভ, অনুবাদক মৌলভী আব্দুল হালীম আনসারী)। ইংরেজ ঐতিহাসিক থমাস কার্লাইল (Thornits Carlyte) মহানবী (স) সম্পর্কে (Her) ant Her Worship) গ্রন্থে লিখেছেন - একথা ঠিক যে, নবী (স) অনেক ধীশক্তিসম্পন্ন ছিলেন এবং রাসূল (স)-এর পর্যবেক্ষণ ছিল গভীর এবং স্মৃতিশক্তি ছিল প্রচণ্ড রকমের।' (অমুসলিমদের দৃষ্টিতে ইসলামের নবী, পৃ-৪১, মুহাম্মদ ইয়াহইয়া খান, জাহানজীব বুলক, অাল্লাম ইকবাল টাউন, লাহাের)। ইউরােপের প্রথিতযশা বিশ্লেষক কে, টি, লাওল -এর বক্তব্য হলাে- মুহাম্মদ (স) একজন বড় রাষ্ট্রপতি, একজন বড় বিজয়ী, অনেক বড় জ্ঞানী ও বিত্তবান ব্যক্তি ছিলেন। নবী (স)-এর প্রতি অপবাদ মক্কার কাফিরগণ যখন প্রতিরােধের কোনাে সাধারণ ভাষা হারিয়ে ফেলে তখন তারা নবী (স) কে পাগল বলতে থাকে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে হাকীমে বর্ণনা করেছেন . ১ L-21 L অর্থঃ হে প্রিয় হাবীব! আপনি আপনার রবের করুণায় পাগল নন। (সূরা কালাম, আয়াত-২) কুরআন মাজীদের এ ধরনের প্রকাশ্য ঘােষণা সার্বক্ষণিক অস্বীকৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি পাগল নন; পাগল ছিলেন না এবং কখনাে পাগল হবেন না । হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদের গুরুত্ব দেয় (এর সম্মান রক্ষা। করে) সে পাগলামি এবং মাথা খারাপ হওয়া থেকে মুক্ত থাকবে এবং কোনাে। কোনাে বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এর জ্ঞান কখনাে লােপ পাবে না (অর্থাৎ সে বােধহীন হবে না)। মাওয়াহিবুর রহমান, প্যার-২৯, পৃ.-২৮, সাইয়েদ আমির আলী মালহাবাদী)। কুরআন মাজীদকে শুধু গুরুত্ব দেয়ার কারণেই যদি এতােটা মর্যাদা লাভ করা যায়, তাহলে তার মর্যাদা কী হবে যার ওপর এ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে ?

 

 

রাসূল (স)-এর দৈহিক শক্তি 

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বীয় মর্যাদাবান বান্দা নবী করীম (স)-কে অপরিমেয় দৈহিক শক্তি দান করেছিলেন। এ ব্যাপারে শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (র) 'মাদারিজুন্নবুওয়াত" গ্রন্থে লিখেন ; হুজুর আকরাম (স)-এর শক্তি, বাহুর শক্তি এবং মজবুতি এতই ছিল যে, বিশ্বখ্যাত কুস্তিগীর (পাহলােয়ান) তার সামনে দাঁড়াতেও পারত না। রুকানা ছিলেন আরবের একজন বিখ্যাত কুস্তিগীর, চারদিকে তার দৈহিক শক্তির সুখ্যাতি ছিল। প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি এক শত লােকের মুকাবিলা করে পরাজিত করে দিতেন। এ ব্যাপারে সুনানে তিরমিযিতে রয়েছে“একদিন নবী (স) আরবের কোনাে পাহাড়ি এলাকায় (মক্কার কোনাে ঘাঁটি) চলতে চলতে রুকানার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। বিশ্বনেতা (স)-এর এ অভ্যাস ছিল যে, যে ব্যক্তি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন হুজুর (স) তাকে ইসলাম গ্রহণ করার দাওয়াত দিতেন। হুজুর (স) রুকানাকেও দাওয়াত দিলেন। বললেন, তােমরা মূর্তিপূজা ত্যাগ করে তাওবা করে নাও এবং অংশীহীন মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আন। রুকানা বলল, আমি এক শর্তের ওপর এ দাওয়াত কবুল করতে প্রস্তুত আছি, তা হলাে আপনি যদি আমাকে পরাজিত করতে পারেন, তবেই আমি ঈমান আনবাে। নবী করীম (স)-এ শর্তে রাজি হলেন। রুকানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, রুকানা। যদি তুমি এ শর্তের ওপর ঈমান আনার ওয়াদা কর তাহলে আমি এ শর্ত পূরণ। করতে তৈরি আছি। সাথে সাথে রুকানা নেংটি পড়ে ময়দানে এসে দাঁড়াল। রাসূল (স)ও তাশরীফ নিলেন। রাসূল (স) বাজু (বাহু) ধরলেন এবং এক ঝটকায় তাকে চিৎ করে ফেলে দিলেন। সে হয়রান এবং পেরেশান হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি প্রস্তুত ছিলাম না। অসাবধানতার মধ্যে আপনি আমাকে পরাজিত করেছেন। আপনি আমাকে আরেকবার পরাজিত করতে পারলে আমি ঈমান আনবাে। রাসূল (স) তার এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। রাসূল (স) প্রস্তুতি নিলেন, তার বাহু ধরে ফেললেন এবং জমিনের ওপর ফেলে দিলেন। রুকানার এ ব্যাপারে সামান্যতম ধারণা ছিল না যে তাকে এতাে সহজেই ফেলে দেয়া যাবে। তাই লজ্জিত অবস্থায় আবার উঠলেন এবং তৃতীয়বারের মতাে আবার কুস্তির দাওয়াত দিলেন। এরপরও রাসূল (স) তাকে এ কথা বলেননি যে, দুবার আমি তােমার শর্ত পূরণ করেছি। বরং আল্লাহর রাসূল পুনরায় কুস্তি লড়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। অতঃপর রাসূল (স) তাকে এমনভাবে ঝটকা দিলেন যে, চোখের পলকে জমিনে ফেলে দিলেন। তিনি এবার আর অস্বীকার করতে পারলেন না, তিনি উচ্চৈঃস্বরে কালিমা শাহাদাত পড়েন এবং ঘােষণা করেন যে, এটা কোনাে দৈহিক শক্তি নয়, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে রূহানি শক্তি দ্বারা তিনবার পরাজিত করেছেন। আমি একথা স্বীকার করে নিলাম যে, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে রুকানা ছাড়াও আরাে অনেক লােক কুস্তি করেছেন এবং তিনি সকলের ওপর বিজয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে আবুল আসাদ ছিলেন একজন বিখ্যাত কুস্তিগীর। যে গরুর চামড়ার ওপর দাড়িয়ে যেত এবং লোকজন তার নিচ থেকে চামড়া টেনে বের করার পূর্ণ শক্তিতে চেষ্টা করত । চামড়া ফেটে যেত কিন্তু নিচ থেকে বের হতাে না। কুস্তিগীর আসাদ একদিন নবী করীম (স)-এর সঙ্গে কুস্তি পড়তে চাইলেন। তিনি বললেন, যদি আপনি আমাকে জমিনের ওপর ফেলতে পারেন তাহলে আমি আপনার ওপর ঈমান আনবাে। নবী কারীম (স) তাকে জমিনের ওপর চিৎ করে ফেলে দেন কিন্তু সে ঈমান আনেনি। নবী করীম (স)-এর দেহ মুবারক ছিল পরিপূর্ণ ও চুড়ান্ত রকমের পবিত্র । হযরত উম্মে আবাদ (রা) রাসূল (স)-এর প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করে বলেন ! রাসূলুল্লাহ (স)-এর পেট বড় হওয়া এবং পেট সামনের দিকে বেড়ে যাওয়ার দোষমুক্ত ছিলেন। (আল অফা বিআহওয়ালি মুস্তফা, পৃ.-৪৫২, ইমাম আব্দুর রহমান ইবন জাওরী ।) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দেহ মুবারক ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত “আমি দ্রুত চলার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রিয় রাসূল (স) থেকে দ্রুত আর কাউকে দেখিনি। যখন তিনি দ্রুত হাটতেন তখন মনে হতাে জমিন নিজে নিজে জড়িয়ে যাচ্ছে। যখন তিনি চলতেন তখন পূর্ণ শক্তি দ্বারা চলতেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর চলন বড়ই মাপা হতাে। এতদসত্ত্বেও কেউ রাসূল (স)-এর গতি অতিক্রম করতে পারেনি। (কিতাবুশ শিফা, পৃ.-৮২, কাজী ইয়াজ আন্দালুসী।) (দ্বিয়াউন নবী খ-৫, পৃ. -২৭৪, পীর করম শাহ, আক্তহারী, দ্বিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স লাহাের।) বর্ণিত বিশ্লেষণ থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, নবীগণ (আ) ছিলেন রােগ-বালাই থেকে নিরাপদ । সকল প্রকারের দৃণার উদ্রেককারী রােগ-বালাই থেকে মুক্ত। বিশেষত আমাদের নবী করীম (স) মানসিক, দৈহিক, আধ্যাত্মিক শক্তি, মেধা, পাণ্ডিত্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক থেকে পৃথিবীর সকল মানুষ থেকে ছিলেন সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম।

 

Friday, November 26, 2021

 

পবিত্রতা অর্জন ও বিজ্ঞান। 

আল্লাহ তাআলার সত্তা পবিত্রতায় পরিপূর্ণ। তিনি সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। একথা সুস্পষ্ট যে পরিচ্ছন্নতার ওপর আল্লাহর জ্যোতি বিদ্যমান। তাই তিনি পবিত্র। তিনি সকল ষড়যন্ত্র থেকে পবিত্র। কোনাে ধরনের ফেরেববাজি, রিয়াকারী এবং হিংসা-বিদ্বেষ যেমন তার সত্তার সাথে সঙ্গত নয় তেমনি কৃপণতা ও সংকীর্ণতার মতাে খারাপ দোষগুলাে থেকেও তিনি সত্তাগতভাবে পবিত্র। তাঁর গুণাবলি পবিত্র ও প্রশংসিত। তিনি প্রশংসিত ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী- মাজীদ। সুতরাং আদেশ হলাে, হে মুসলমানগণ মাখলুক বা সৃষ্ট জীব হওয়ার কারণে। তােমাদের পক্ষে যতদূর সম্ভব তােমরাও আল্লাহর চরিত্র এবং গুণাবলি নিজেদের মধ্যে ধারণ কর । তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হও। এটা স্পষ্ট যে, একজন প্রকৃত আমলকারী মুসলমানের জীবন সকল দিক হতে পাক-পবিত্র, সকল প্রকারের অনিষ্টকারী জীবাণু থেকে সংরক্ষিত। তিনি সকল রকমের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য অপবিত্রতা থেকে পাক-সাফ হয়ে থাকেন। তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি হিংসা লালসা মনে রাখবেন না। চুরি-ডাকাতি ও ব্যভিচার করবেন না। গালমন্দ করবেন না। সবসময় সত্য বলবেন এবং মিথ্যা হতে বেঁচে থাকবেন। প্রদর্শনী থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন। ফেরেজি, ধোকাবাজি কখনও করবেন না। নিজস্ব কাজ ও কথায় সকল মুসলমান নিজেরা যা করে তার উদাহরণ নিজেই হবেন । অপরকে কখনাে কষ্ট দেবেন না এবং ক্ষতি করবেন না। বরং সবসময় অন্যদের সাহায্য ও পথ প্রদর্শনের জন্য তৈরী থাকবেন এবং অন্যদের অধিকার বিনষ্ট করবেন না। দুর্বলদের সহায়তা করবেন, প্রতিবেশীদের সাথে ভালাে আচরণ করবেন। নবী করীম (স) ইরশাদ করেন- অর্থ ও প্রকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ মুসলমান তিনি যার মুখ এবং হাত হতে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে। আরেকটি হাদীস- নবী করীম (স) ঘােষণা করেন, 'তােমাদের মাঝে কোনাে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজ মুসলমান ভাইয়ের জন্য ঐ জিনিস না চাইবে যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে। 

মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ হলাে হালাল খাবে, হারাম থেকে বেঁচে থাকবে, নিজের চিন্তাধারাকে পাক-পবিত্র রাখবে। দেহকে পবিত্র রাখবে, পােশাক-পরিচ্ছন্ন রাখবে, কথা ও কাজ পবিত্র করবে, মিথ্যা বলবে না এবং কার্যাবলি পবিত্র রাখবে। যেন এ অনুভূতি হয় যে, প্রত্যেক মুসলমান সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকারের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র। ইসলামে নামাযের বৈশিষ্ট্য কেন্দ্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত নামায আদায়ের জন্য পূর্ব শর্ত হলাে, ব্যক্তির দেহ পাক-পবিত্র হবে। তার পােশাক পবিত্র হতে হবে, তিনি ওযু সম্পন্ন করবেন। নামাযের আগে সব রকমের শারীরিক পবিত্রতা প্রয়ােজন। 

নবী করীম (স) ঘােষণা করেন- অর্থ ও পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। (সহীহ মুসলিম) অন্যত্র ঘােষণা করেন । ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।(সুনানে তিরমিযী) এতে স্পষ্ট হলাে যে, একজন মুসলমানের জন্য তার ঈমানের অংশ হলো সবসময় পবিত্র থাকা। ইসলাম প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য পবিত্রতার দীক্ষা এতটাই দিয়েছে, অমুসলমানদের পথিকৃৎগণও একথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন যে, ইসলাম যে পরিমাণ পবিত্রতার ওপর জোর দিয়েছে অপর কোনাে ধর্ম তা দিতে পারেনি। তাই ভা, রবার্ট থি, বিশ্ব বিখ্যাত সার্জন মাসলামা প্রমুখ লিখেছেন, 'আমরা পবিত্রতার আমল ইসলাম হতে শিখেছি। সবচেয়ে বড় গান্ধা ঐ জিনিস যা মানুষের দেহ থেকে পায়খানা-প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়। ইসলাম এগুলাে নিগর্ত হওয়ার পর উত্তমরূপে ইস্তিঞ্জা (পবিত্রতা অর্জন করার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। ইসলামে নির্দেশ আছে যে, যদি মানুষের প্রকৃতির ডাক যেমন প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়ােজন হয়, তাহলে সবার আগে এ প্রয়ােজন শেষ করে পবিত্রতা অঙনি তথা ইস্তিঞ্জা করতে হবে। প্রথমে উত্তমরূপে মাটির ঢেলা দ্বারা পরিষ্কার এবং তারপর দুবার পানি দ্বারা উত্তমরূপে ধৌত করতে হবে। অথবা পুণরায় পানি দ্বারা যথেষ্টভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। পরিষ্কার করার জন্য বাম হাত ব্যবহার করতে হবে। পায়খানা-প্রস্রাব করার সময় কিবলার দিকে পিঠ অথবা মুখ করা যাবে না, চাই সেটা খােলা জায়গা বা ঘর হােক। যদি মনের ভুলে এমন হয় তাহলে মনে হওয়ার সাথে সাথে দিক পরিবর্তন করে নিতে হবে। প্রস্রাব-পায়খানা করার সময় খালি মাথায় যাওয়া যাবে না এবং বাতাসমুখী হয়েও বসা যাবে না।

পায়খানা-প্রস্রাব থানায় যাওয়ার সময় মুস্তাহাব হলাে বাথরুমে প্রবেশের আগে নিচের দুআ পড়া

بسم الله اللهم اني أغرب من الحب الخايب.

অর্থ : আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমি খৰীস (দুই) পুরুষ নি এবং নারী জ্বিন থেকে তোমার আশ্রয় চাই। (সহীহ বুখারী) টয়লেটে পায়খানা করতে সর্বপ্রথমে বাম পা ভেতরে রাখবে, যখন বসার নিকটবর্তী হবে তখন শরীর হতে কাপড় গুছিয়ে নেবে এবং প্রয়ােজনের অতিরিক্ত নগ্ন হবে । পা ছড়িয়ে বা-পায়ের ওপর জোর দেবে এবং চুপ থেকে প্রয়ােজন সারবে। যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন পুরুষ বাম হাতের আঙুল দ্বারা গুপ্তাঙ্গের গোঁড়া থেকে অগির দিকে চাপ দেবে যাতে পেশাবের যে ফোটা ভেতরে রয়েছে তা শরীর হতে বের হয়ে যায় । অতঃপর পানি, মাটির ঢেলা অথবা একের পর অনাটি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে। এর আগে তিনটি ঢেলা দিয়ে অতঃপর পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে। ডান হাত দ্বারা পানি ঢালবে এবং বাম হাত দ্বারা ধৌত করবে। পানির পাত্র এমন উচুতে রাখবে না যাতে ছিটা শরীরে লাগার সম্ভাবনা থাকে। প্রথমে প্রস্রাবের স্থান ধৌত করবে পরে মলদ্বার। মলদ্বার ধােয়ার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের জোর কমিয়ে ঢিলে রাখবে এরপর উত্তমরূপে ধােবে, যাতে পােয়র পর হাতে কোন গন্ধ অবশিষ্ট না থাকে। অতপর কোনাে পবিত্র কাপড় দ্বারা মুছে নেবে। যদি কাপড় না থাকে তাহলে বারবার হাত দিয়ে মুছবে। একথা মনে রাখবে যে, খাড়া হওয়ার আগে শরীর ঢেকে নেবে এবং বের হয়ে আসবে। বের হওয়ার সময় ডান পা প্রথমে বের করবে এবং এ দুআ পড়বে


অর্থ ও সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমার কাছ হতে কষ্টদায়ক দ্রব্য সরিয়ে দিয়েছেন এবং উপকারী দ্রব্য সন্নিকটবর্তী করেছেন। প্রস্রাব-পায়খানা হতে বের হওয়ার পর আরো একটি দুআ রাসূল (স) থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন রাসূল (স) হাজত অর্থাৎ, প্রাকৃতিক প্রয়ােজন পূরণ করতেন তখন সে স্থান ত্যাগ করে পড়তেন এLI -“হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।' (যাদুল মাআদ) ইস্তিঞ্জা পানি অথবা মাটির ঢেলা দিয়ে অথবা উভয় কর্তৃক করা উচিত । হাড়ি অথবা গােৰৰ ব্যাতীয় জিনিষ ইত্যাদি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করা ঠিক নয়। কেননা এগুলাের ভেতর ক্ষতিকর জিনিস থাকে।

 

 

 

Wednesday, November 24, 2021

 

"ইমাম আবু হানিফা (র:) ও নাস্তিকদের  বিতর্ক।"

.
একবার একদল নাস্তিক ও তাদের নেতারা একজন বিখ্যাত মুসলিম নেতার (ইমাম আবু হানিফা (র:) সাথে বিতর্ক অনুষ্ঠানের জন্য আহবান  জানালেন। যদিও ইমাম আবু হানিফা (র:) বিতর্ক করার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। তারপরও তিনি রাজি হলেন। বিতর্কের বিষয় এই পৃথিবীর সবকিছু কারো সাহায্য ছাড়াই এমনিতেই তৈরী হয়েছে? না কি হয়নি? অনুষ্ঠানের দিন সবাই নিধারীত সময়ে উপস্থিত। শুধুমাত্র ইমাম আবু হানিফা (র:) নেতা বাদে। সকলেই অপেক্ষা করছেন ইমাম আবু হানিফা (র:) এর জন্য। কেননা তিনিই মুলত বিতর্কে অংশগ্রহন করবেন মুসলিমদের পক্ষ হতে। সকলেই অপেক্ষা করছেন অথচ তার কোন দেখা নাই। একদিকে নাস্তিকরা মনে মনে খুশি হতে লাগল। অন্যদিকে মুসলিমরা লজ্জা বোধ করছিল, তাদের নেতার অনুপস্থিত থাকাতে। অনেকেই ধরে নিলেন তিনি হয়ত আর আসবেন না পরাজয়ের ভয়ে। একটি সময় সকলে সিদ্ধান্ত নিল যে অনুষ্ঠান শেষ করে দিতে হবে। ঠিক তখনই তিনি উপস্থিত হলেন। মঞ্চে উঠার পর সকলেই তার নিকট জিজ্ঞাসা করল কি কারনে আপনার আসতে এত দেরি হলো। তিনি একটু চুপ থেকে বললেন আজ এক অবাক করার মত ঘটনা ঘটেছে যাহা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আর এই কারনে আমার আসতে দেরি হয়ে গেল। সকলেই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলো। তিনি বললেন আমার ধারনা, তোমরা এই ঘটনা শোনার পর আমার কথা বিশ্বাস করবে না অথবা আমাকে পাগল বলবে। এজন্য আমি এই ঘটনা এই সমাবেশে বলতে চাই না। নাস্তিকদের দলনেতা বললেন। আপনার মত একজন বিজ্ঞ ব্যাক্তি কখনও এমন কোন কথা বলবে না, যাহার কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই। নাস্তিক নেতা তাকে অনুরোধ করলেন ঘটনাটি সকলের সামনে বলতে। তার অনুরোধে মুসলিম পন্ডিত ইমাম আবু হানিফা (র:) বলতে শুরু করলেন। আজ বাড়ি হতে বের হয়ে যখন নদীর ঘাটে পৌছেছি, তখন দেখি নদীতে কোন নৌকা নেই। আশেপাশেও কোন লোকজনও নেই। আমি দীর্ঘক্ষন অপেক্ষা করছি নৌকার জন্য। হঠাৎ বিকট আওয়াজ করে একটি গাছ নদীতে পড়ে গেল। তারপর গাছটি ছোট ছোট টুকরো হতে শুরু করল। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। এরপর টুকেরো গুলো একটি আরেকটির সাথে যুক্ত হতে লাগল। কিছুক্ষনের ভিতর এটি একটি নৌকাতে পরিনত হলো। অতপর নৌকাটি ধিরে ধিরে আমার ঘাটের দিক এগিয়ে এলো। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। যেহেতু ঘাটে নৌকা ছিল না তাই সাহস করে নৌকাটির উপর উঠে পড়লাম। নৌকাটি নিজে থেকে চলতে শুরু করল আর আমাকে নদী পার করে দিল। তারপর আমি হেটে চলে আসলাম। আর এসব ঘটনা ঘটছিল অনেক সময় ধরে। যার কারনে আমার আসতে দেরি হয়ে
গেল। নাস্তিকদের সকলেই হো হো করে হেসে উঠল। মুসলিমরা সবাই কানাকানি করতে লাগল। নাস্তিকদের দলনেতা বলেই ফেল্লেন আপনাকে কেউ কিছু খাইয়ে(মদ বা নেশার জাতীয়) দিয়েছে কিনা?  নাস্তিক নেতা বললেন এমনি এমনি এভাবে কোন কিছু হওয়া কি সম্ভব।? আপনিতো পাগলের মতো কথা বলছেন। তখন ইমাম আবু হানিফা (র:) বললেন, আমি না হয় একা পাগল হয়েছি। কিন্তু  আপনারা নাস্তিকরা সবাই একত্রে  পাগল হলেন কিভাবে। আমি ত শুধু একটি গাছ হতে একটি নৌকা তৈরী হওয়ার কথা বললাম। আর আপনারা বলছেন এই মহাবিশ্বের চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী, গাছপালা, পশুপাখি সবকিছু এমনিতেই সৃষ্টি হয়ে গেছে। আর এভাবেই ইমাম আবু হানিফা (র:) বির্তকের ইতি টানলেন।

Monday, November 22, 2021

 

স্রষ্টা কেন মন্দ কাজের দায় নেন না?

'আলহামদুলিল্লাহ ভালো বলেছো কে কে?'

অদ্ভুত প্রশ্ন। সবাই থতমত খেলো

 ক্লাশের সর্বমোট সাতজন দাঁড়ালো । এরা সবাই 'আলহামদুলিল্লাহ ভালো ' বলেছে। স্যার সবার চেহারাটা একটু ভালো মতো পরখ করে নিলেন। এরপর পিক করে হেসে দিয়ে বললেন,- 'বসো।' সবাই বসলো । আজকে আর মনে হয় এ্যাকাডেমিক পড়াশুনা হবেনা। দর্শনের তাত্বিক আলাপ হবে। ঠিক তাই  হলো । মফিজুর রহমান স্যার আদনানকে দাঁড় করালো । বললেন, 'তুমিও বলেছিলে সেটা, না?' - 'জ্বি স্যার।'- আদনান উত্তর দিলো । স্যার বললেন,- 'আলহামদুলিল্লাহ' অর্থ কি জানো?" আদনান মনে হয় একটু ভয় পাচ্ছে। সে ঢোঁক গিলতে গিলতে বললো,- 'জ্বি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ অর্থ হলো- সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।" স্যার বললেন,- 'সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।'

স্যার এই বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করলেন এরপর আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,- 'বসো' আদনান বসলো এবার স্যার রিতাকে দাঁড় করালেন স্যার রিতার কাছে জিজ্ঞেস করলেন,- 'আচ্ছা, পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি আছে?" রিতা বললো,- 'আছে' - 'খুন-খারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ? -- 'জ্বি, আছে' - 'কথা দিয়ে কথা না রাখা, মানুষকে ঠকানো, লোভ-লালসা এসব?" - 'জ্বি, আছে' - 'এগুলো কি প্রশংসা যোগ্য ?'

'তাহলে মানুষ একটি ভালো কাজ করার পর তার সব প্রশংসা যদি আল্লাহর হয়, মানুষ যখন চুরি-ডাকাতি করে, লোক ঠকায়, খুন-খারাবি করে, ধর্ষণ করে, তখন সৰ মন্দের ক্রেডিট আল্লাহকে দেওয়া হয়না কেনো? উনি প্রশংসার ভাগ পাবেন, কিন্তু দূর্নামের ভাগ নিবেন না, তা কেমন হয়ে গেলো না?'

রিতা মাথা নিচু করে চুপ করে আছে।স্যার বললেন, 'এখানেই ধর্মের ভেল্কিবাজি। ইশ্বর সব ভালোটা বুঝেন, কিন্তু মন্দটা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আদতে, ইশ্বর বলে কেউ নেই। যদি থাকতো, তাহলে তিনি এরকম একচোখা হতেন না। বান্দার ভালো কাজের ক্রেডিটটা নিজে নিয়ে নিবেন, কিন্তু বান্দার মন্দ কাজের বেলায় বলবেন- "উহু, অইটা থেকে আমি পবিত্র। অইটা তোমার ভাগ। স্যারের কথা শুনে ক্লাশে যে 'জন নাস্তিক আছে, তারা হাত তালি দেওয়া শুরু করলো। সাজিদের পাশে যে নাস্তিকটা বসেছে, সে তো বলেই বসলো,- 'মফিজ স্যার হলেন আমাদের বাঙলার প্লেটো

স্যার বলেই যাচ্ছেন ধর্ম আর স্রষ্টার অসারতা নিয়ে

এবার সাজিদ দাঁড়ালো। স্যারের কথার মাঝে সে বললো,- 'স্যার, সৃষ্টিকর্তা একচোখা নন। তিনি মানুষের ভালো কাজের ক্রেডিট নেন না। তিনি ততোটুকুই নেন, যতোটুকু তিনি পাবেন। ইশ্বর আছেন। স্যার সাজিদের দিকে একটু ভালোমতো  তাকালেন। বললেন,- 'শিওর?' - 'জ্বি।' - 'তাহলে মানুষের মন্দ কাজের জন্য কে দায়ী? - 'মানুষই দায়ী।- সাজিদ বললো - ' ভালো কাজের জন্য?' - 'তাও মানুষ' স্যার এবার চিৎকার করে বললেন,- 'এক্সাক্টলি, এটাই বলতে চাচ্ছি। ভালো /মন্দ এসব মানুষেরই কাজ। সুতরাং এর সব ক্রেডিটই মানুষের। এখানে স্রষ্টার কোন হাত নেই। সুতরাং, তিনি এখান থেকে না প্রশংসা পেতে পারেন, না তিরস্কার। সোজা কথায়, স্রষ্টা বলতে কেউই নেই।' ক্লাশে পিনপতন নিরবতা। সাজিদ বললো,- 'মানুষের ভালো কাজের জন্য স্রষ্টা অবশ্যই প্রশংসা পাবেন, কারন, মানুষকে স্রষ্টা ভালো কাজ করার জন্য দুটি হাত দিয়েছেন, ভালো জিনিস দেখার জন্য দুটি চোখ দিয়েছেন, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক দিয়েছেন, দুটি পা দিয়েছেন। এসবকিছুই স্রষ্টার দান। তাই ভালো কাজের জন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাবেন।' স্যার বললেন, 'এই গুলো দিয়ে তো মানুষ খারাপ কাজও করে, তখন?" - 'এর দায় স্রষ্টার নয়।' - 'হা হা হা হা। তুমি খুব মজার মানুষ দেখছি।হা হা হা হা।' সাজিদ বললো,- 'স্যার, স্রষ্টা মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। এটা দিয়ে সে নিজেই নিজের কাজ ঠিক করে নেয়। সে কি ভালো করবে, না মন্দ।'

স্যার তিরস্কারের সুরে বললেন, - 'ধর্মীয় কিতাবাদির কথা বাদ দাও, ম্যান কাম টু দ্য পয়েন্ট এন্ড বি লজিক্যাল' সাজিদ বললো, - 'স্যার, আমি কি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারি ব্যাপারটা? - 'অবশ্যই'- স্যার বললেন সাজিদ বলতে শুরু করলো'ধরুন, খুব গভীর সাগরে একটি জাহাজ ডুবে গেলো ধরুন, সেটা বার্মুডা ট্রায়াঙ্গাল এখন কোন ডুবুরিই সেখানে ডুব দিয়ে জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারছে

বার্মুডা ট্রায়াঙ্গালে তো নয়ই। এই মূহুর্তে ধরুন সেখানে আপনার আবির্ভাব ঘটলো। আপনি সবাইকে বললেন, 'আমি এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে দিতে পারি, যেটা গায়ে লাগিয়ে যেকোন মানুষ খুব সহজেই ডুবে যাওয়া জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারবে। ডুবুরির কোনরকম ক্ষতি হবে না।' স্যার বললেন,- 'হুম, তো?' - 'ধরুন, আপনি যন্ত্রটি তৎক্ষণাৎ বানালেন, এবং একজন ডুবুরি সেই যন্ত্র গায়ে লাগিয়ে সাগরে নেমে পড়লো ডুবে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে।' ক্লাশে তখন একদম পিনপতন নিরবতা। সবাই মুগ্ধ শ্রোতা। কারো চোখের পলকই যেনো পড়ছেনা। সাজিদ বলে যেতে লাগলো

ধরুন, ডুবুরিটা ডুব দিয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে সে | দেখলো, মানুষগুলো হাঁসপাশ করছে। সে একে একে সবাইকে একটি করে

অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়ে দিলো। এবং তাদের একজন একজন করে উদ্ধার করতে লাগলো।' স্যার বললেন,- 'হুম।' - 'ধরুন, সব যাত্রীকে উদ্ধার করা শেষ। বাকি আছে মাত্র একজন। ডুবুরিটা যখন শেষ লোকটাকে উদ্ধার করতে গেলো, তখন ডুবুরিটা দেখলো- এই লোকটাকে সে আগে থেকেই চিনে।'

এতটুকু বলে সাজিদ স্যারের কাছে প্রশ্ন করলো,- 'স্যার, এরকম কি হতে পারেনা?' স্যার বললেন, 'অবশ্যই হতে পারে লােকটা ডুবুরির আত্মীয় বা পরিচিত হয়ে যেতেই পারে অস্বাভাবিক কিছু নয়' সাজিদ বললো,- 'জ্বি৷ ডুবুরিটা লোকটাকে চিনতে পারলো সে দেখলো,- এটা হচ্ছে তার চরম শত্রু এই লোকের সাথে তার দীর্ঘ দিনের বিরোধ চলছে এরকম হতে পারেনা, স্যার? - 'হ্যাঁ, হতে পারে' সাজিদ বললো,- 'ধরুন, ডুবুরির মধ্যে ব্যক্তিগত হিংসাবোধ জেগে উঠলো সে শক্রতাবশঃত ঠিক করলো যে, এই লোকটাকে সে বাঁচাবেনা কারন, লোকটা তার দীর্ঘদিনের শত্রু সে একটা চরম সুযোগ পেলো এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠলো ধরুন, ডুবুরি অই লোকটাকে অক্সিজেনের সিলিন্ডার তো দিলোই না, উল্টো উঠে আসার সময় লোকটাকে পেটে একটা জোরে লাথি দিয়ে আসলো' ক্লাশে তখনও পিনপতন নিরবতা সবাই সাজিদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে স্যার বললেন, 'তো, তাতে কি প্রমান হয়, সাজিদ?' সাজিদ স্যারের দিকে ফিরলো ফিরে বললো,- 'Let me finish my beloved sir....' - 'Okey, you are permitted. carry on'- স্যার বললেন

সাজিদ এবার স্যারকে প্রশ্ন করলো, 'স্যার, বলুন তো, এই যে, এতগুলো ডুবে যাওয়া লোককে ডুবুরিটা উদ্ধার করে আনলো, এর জন্য আপনি কি কোন ক্রেডিট পাবেন? স্যার বললেন, 'অবশ্যই আমি ক্রেডিট পাবো। কারন, আমি যদি অই বিশেষ যন্ত্রটি না বানিয়ে দিতাম, তাহলে তো এই লোকগুলোর কেউই বাঁচতো না।' সাজিদ বললো,- 'একদম ঠিক স্যার। আপনি অবশ্যই এরজন্য ক্রেডিট পাবেন। কিন্তু, আমার পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে- 'ডুবুরিটা সবাইকে উদ্ধার করলেও, একজন লোককে সে

শক্রতা বশঃত উদ্ধার না করে মৃত্যুকূপে ফেলে রেখে এসেছে আসার সময় তার পেটে একটি জোরে লাথিও দিয়ে এসেছে ঠিক?' - 'হুম' - 'এখন স্যার, ডুবুরির এহেন অন্যায়ের জন্য কি আপনি দায়ী হবেন? ডুবুরির এই অন্যায়ের ভাগটা কি সমানভাবে আপনিও ভাগ করে নেবেন?' স্যার বললেন, 'অবশ্যই না ওর দোষের ভাগ আমি কেনো নেবো? আমি তো তাকে এরকম অন্যায় কাজ করতে বলিনি সেটা সে নিজে করেছে সুতরাং, এর পুরো দায়

সাজিদ এবার হাসলো। হেসে সে বললো,- 'স্যার, ঠিক একইভাবে, আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ভালো কাজ করার জন্য। আপনি যেরকম ডুবুরিকে একটা বিশেষ যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছেন, সেরকম সৃষ্টিকর্তাও মানুষকে অনুগ্রহ করে হাত, পা, চোখ, নাক, কান, মুখ, মস্তিষ্ক এসব দিয়ে দিয়েছেন। সাথে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। এখন এসব ব্যবহার করে সে যদি কোন ভালো কাজ করে, তার ক্রেডিট স্রষ্টাও পাবেন, যেরকম বিশেষ যন্ত্রটি বানিয়ে আপনি ক্রেডিট পাচ্ছেন। আবার, সে যদি এগুলো ব্যবহার করে কোন খারাপ কাজ করে, গর্হিত কাজ করে, তাহলে এর দায়ভার স্রষ্টা নেবেন না। যেরকম, ডুবুরির অই অন্যায়ের দায় আপনার উপর বর্তায় না। আমি কি বোঝাতে পেরেছি, স্যার?'