Wednesday, June 2, 2021

 

হযরত খাব্বাব (রা) এর ত্যাগ  কুরবানী

হযরত ওমর(রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নগ্ন তরবারী হাতে নিয়ে যেদিন রাসূল (সা) কে হত্যা করতে রওয়ানা হয়েছিলেন, সেইদিন পথিমধ্যে নিজের বোন ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে সাময়িকভাবে গন্তব্য স্থান পরিবর্তন করেন এবং প্রথমে বোন ভগ্নিপতিকে ইসলাম গ্রহণের শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বোনের বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পান তারা কুরআন পড়ছে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়াচ্ছিল তিনি ছিলেন খাব্বাব ইবনে আরত(রা)
হযরত ওমর বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই খাব্বাব প্রাণভয়ে আত্মগোপন করেন। কেননা বোন ভগ্নিপতি রক্তের টানে রক্ষা পেলেও সেদিন খাব্বারের বাঁচার কোনো আশা ছিল না ওমরের নগ্ন তরবারী হতে।
সেদিন যা হবার তা হলো। প্রথম সাক্ষাতে বোন ভগ্নিপতি কিছু মার খেলেও কুরআনের আয়াত টি পড়ে তাঁর আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি রাসূলের(সা) কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। খাব্বাবের সাথে হযরত ওমরের হয়েছিল সেইদিন প্রথম সাক্ষাত।
তারপর দরিদ্র খাব্বাবের উপর মক্কার কোরেশদের আরো অনেক নির্যাতন হয়েছে। হযরত ওমর শুনেছেন, কিন্তু প্রতিকার করতে পারেন নি। কিন্তু আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে হযরত ওমরের সামনে বসে আছেন মহান ত্যাগী সাহাবী খাব্বাব। আজ ইসলাম বিজয়ী আসনে অধিষ্ঠিত। হযরত ওমর আজ মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা। তাওহীদ রিসালাতের সাথে সংঘর্ষে কুফর শিরক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর হয়ে ইসলামের আলোকে চারদিক উদ্ভাসিত।
কিন্তু হযরত ওমরের(রা) প্রবল ইচ্ছা, খাব্বাবের সেই নির্যাতনের কাহিনীগুলো শুনবেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, “ইসলাম গ্রহণের পর আপনার উপর কি ধরনের নির্যাতন হয়েছে, একটু বলবেন?”
হযরত ওমরের প্রশ্ন হযরত খাব্বাবকে আবার দূর অতীতে টেনে নিয়ে গেল এবং মক্কার ১৩ বছরের সেই রক্তক্ষরা দিনগুলিকে তার চোখের সামনে হাজির করলো। সে নির্যাতনে ঈমান একীনে উজ্জীবিত মর্দে মুমিনরা ছাড়া আর কেউ তেরো বছর তো দূরের কথা, তেরো দিনও বরদাশত করতে পারতো না। হযরত খাব্বাব কোন্ কাহিনী দিয়ে শুরু করবেন এবং কোনটা বাদ্ দিয়ে কোনটা বলবেন। তাই ভেবে ভেবে কয়েক মুহুর্ত নীরবে কাটিয়ে দিলেন। শেষে বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না।
অবশেষে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজের জামা খুলে কোমরের একটি অংশ আমিরুল মোমেনীনকে দেখালেন। জায়গাটা ছিল জখমের চিহ্নে পরিপূর্ণ। আমীরুল মুমিনীন দেখামাত্র চিৎকার করে বলে উঠলেনঃআল্লাহু আকবার! এই নাকি আপনার কোমর। আমি তো আজ পর্যন্ত কোন মানুষের এমন কোমর দেখি নি।
খাব্বাব বললেন, “জি, আমিরুল মোমেনীন, কতবার যে আমাকে লোহার বর্মসহ তপ্ত মরুভূমিতে টেনে হিচড়ে বেড়ানো হয়েছে এবং কতবার যে আমার কোমরের চর্বিতে ওদের আগুন নিভেছে, তা আমি স্মরণ করতে পারি না। তারপর আল্লাহর শোকর যে, একদিন আমরা সমস্ত নির্যাতন থেকে মুক্তি পেলাম।
সহসা হযরত খাব্বাব কান্না শুরু করে দিলেন। হযরত ওমর বললেন, “ খাব্বাব, আজ কেন কাঁদছেন?” হযরত খাব্বাব চোখের পানি ফেলতে ফেলতে জবাব দিলেন, “আমি কাঁদছি এজন্য যে, জেহাদের পর জেহাদ করে বিজয় অর্জন করার পর আল্লাহ আমাদের জন্য সুখ সমৃদ্ধি ধন দৌলতের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আমাদের মাথার উপর সম্মান মর্যাদার পতাকা উড়ছে। আমার আশংকা হয় যে আমাদের ক্ষুদ্র সৎ কাজগুলির প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে কি না এবং আখেরাতে আমাদের খালি হাতে উঠতে হবে কি না।
এই নিঃস্বার্থ ত্যাগী পুরুষ ইন্তিকালের সময় ওসিয়ত করেন, “ আমাকে তোমরা লোকালয়ে নয়, কুফার জংগলে কবর দিও। জংগল আমাকে ডাকছে।
তাঁর ইন্তিকালের পর একদিন হযরত আলী (রা) তাঁর কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, “আল্লাহ খাব্বাবের ওপর রহমত করুন। তিনি স্বেচ্ছায় সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন, সানন্দে হিজরত করেন, জেহাদে জীবন কাটান এবং মুসিবতের পর মুসিবত বরদাশত করেন। অথচ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে এক চুলও বেশি পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন নি।

 

No comments:

Post a Comment