এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী হয়েছে যে, যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিস্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। (যুমার, :৬৫)
‘‘যদি তুমি শিরক (আল্লাহর অংশী স্থির) কর’’ এর অর্থ হল, যদি তোমার মৃত্যু শিরকের উপরেই আসে এবং তা থেকে তওবা না কর। তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে, না লাভ এবং বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও যমীনের মাঝে ? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছ। (সুরা ইউনুস- 18)
অতঃপর আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে সান্নিধ্য লাভের জন্যে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বরং তারা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে গেল। এটা ছিল তাদের মিথ্যা ও মনগড়া বিষয়। (আল আহকাফ- 28)
আর উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে, না লাভ এবং বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও যমীনের মাঝে ? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছ। (সুরা ইউনুস- 18)
জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (আয যুমার -3)
তাওহীদ যেমন প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, যথা:
(এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
(দুই) আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা (তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত)। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(তিন) আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা (তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত)। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
তাওহীদ যেমন প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, যথা:
(এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
(দুই) আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা (তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত)। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(তিন) আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা (তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত)। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
তাওহীদ যেমন প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, যথা:
(এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
(দুই) আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা (তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত)। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(তিন) আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা (তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত)। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
আল্লাহ
তাআলা
কুরআনুল কারিমের অনেক
জায়গায়
বারবার
শিরক
করা
থেকে
বিরত
থাকতে
বলেছেন। শিরকে
বড়
জুলুম
বলে
আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ
তাআলার
সঙ্গে
কোনো
ব্যক্তি বা
বস্তুকে অংশীদার সাব্যস্ত করার
ব্যাপারে নিষেধ
করেছেন। আল্লাহ
বলেন-
‘যখন লোকমান উপদেশস্বরূপ তার ছেলেকে বলল- হে ছেলে! আল্লাহর সাথে শরিক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরিক করা মহা অন্যায়।’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১৩)
আল্লাহর অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গোনাহ মাফ করলেও তার সঙ্গে শিরক তথা অংশীদার স্থাপন করার গোনাহ কখনো মাফ করবেন না। আর যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে অংশীদার স্থাপন করবে তাদের শাস্তিও মারাত্মক। কুরআনে শিরকের যে গোনাহ ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে, তাহলো-
>> নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক আল্লাহর সাথে শরিক তথা অংশীদার সাব্যস্ত করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন আল্লাহকে অপবাদ দিলো।’ (সুরা নিসা : আয়াত ৪৮)
>> তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিময়-তনয় মসীহ (ঈসা)-ই আল্লাহ; অথচ মসীহ বলেন, হে বনি ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, যিনি আমার পালন কর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ৭২)
>> আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা আল্লাহকে অস্বীকারকারী, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। সৃষ্টির মধ্যে তারাই নিকৃষ্ট।’ (সুরা বাইয়্যেনাহ : আয়াত ৬)
শিরক মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে ৭টি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। আর তাহলো-
>> হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু
বর্ণনা
করেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া
সাল্লাম বলেছেন,
তোমরা
৭টি
ধ্বংসকারী বস্তু
থেকে
বেঁচে
থাকো।
তারা
জানতে
চাইলেন,
হে
আল্লাহর রাসুল!
সেগুলো
কী?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া
সাল্লাম বললেন-
শিরক সবচেয়ে বড় পাপ
কবিরা গুনাহ কী? অনেকেই মনে করেন, কবিরা গুনাহ মাত্র সাতটি, যার বর্ণনা একটি হাদিসে এসেছে। মূলত কথাটি ঠিক নয়।
কেননা হাদিসে বলা হয়েছে, উল্লিখিত সাতটি গুনাহ কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা উল্লেখ করা হয়নি যে শুধু এ সাতটি গুনাহই কবিরা গুনাহ, আর কোনো কবিরা গুনাহ নেই। এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কবিরা গুনাহ সাত থেকে ৭০ পর্যন্ত। (তাবারি)
ইমাম শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.) বলেন, উক্ত হাদিসে কবিরা গুনাহের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, কবিরা গুনাহ হলো, যেসব গুনাহের কারণে দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক শাস্তির বিধান আছে এবং আখিরাতে শাস্তির ধমক দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যেসব গুনাহের কারণে কোরআন ও হাদিসে ঈমান চলে যাওয়ার হুমকি বা অভিশাপ ইত্যাদি এসেছে, তাকেও কবিরা গুনাহ বলে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার ফলে কোনো কবিরা গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না। আবার একই সগিরা গুনাহ বারবার করার কারণে তা সগিরা (ছোট ) গুনাহ থাকে না। ওলামায়ে কেরাম কবিরা গুনাহের সংখ্যা ৭০টির অধিক উল্লেখ করেছেন। সেগুলো পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হবে—
১ নম্বর কবিরা গুনাহ
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক
করা।
শিরক দুই প্রকার। এক.
শিরকে আকবার, আল্লাহর সঙ্গে
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো
ইবাদত করা। অথবা যেকোনো
ধরনের উপাসনা আল্লাহ ছাড়া
অন্য কিছুর জন্য নিবেদন
করা। যেমন—আল্লাহ ছাড়া
অন্য কারো উদ্দেশে প্রাণী
জবেহ করা ইত্যাদি। পবিত্র
কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে
আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে
শিরক করাকে ক্ষমা করবেন
না। তবে শিরক ছাড়া
অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা
ক্ষমা করবেন। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত
: ৪৮)
দুই. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক। রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আমল করা ইত্যাদি। এটিও শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব মুসল্লির, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন। যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে। ’ (সুরা : মাউন, আয়া : ৪-৬)
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি অংশীদারি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে আর ওই কাজে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি ওই ব্যক্তিকে তার শিরকে ছেড়ে দিই। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৩০০)
‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক তথা অংশীদার স্থাপন করা।’
জাদু
করা,
কারণ
ছাড়া
কাউকে
হত্যা
করা,
আল্লাহ
যা
হারাম
করেছেন,
সুদ
খাওয়া,
ইয়াতিমের মাল
খাওয়া,
জেহাদ
থেকে
পলায়ন
করা,
সতি
নারীর
প্রতি
অপবাদ
দেয়া।’
(বুখারি)
>> হজরত আবু বকর
রাদিয়াল্লাহু আনহু
বর্ণনা
করেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া
সাল্লাম একদিন
৩
বার
বলেন,
‘আমি
কি
তোমাদেরকে সবচেয়ে
বড়
(কবিরা)
গোনাহ
সম্পর্কে অবহিত
করবো
না?
সবাই
বললেন,
হে
আল্লাহর রাসুল!
অবশ্যই
বলুন।
তিনি
বললেন-
‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক বা অংশীদার স্থাপন করা।’
আর
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।
তিনি
হেলান
দিয়ে
বসেছিলেন; এবার
সোজা
হয়ে
বসলেন
এবং
বললেন,
শুনে
রাখ!
মিথ্যা
সাক্ষ্য দেয়া,
এ
কথাটি
তিনি
বার
বার
বলতে
থাকলেন। এমনকি
আমরা
বলতে
লাগলাম,
আর
যদি
তিনি
না
বলতেন।
(বুখারি,
মুসলিম,
তিরমিজি)
কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায় শিকর কবিরা গোনাহ। আল্লাহ তাআলা শিরকের গোনাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। এ গোনহের ফলে মানুষের জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়। জাহান্নাম অবধারিত।
সুতরাং শিরকমুক্ত থাকতে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পড়া সে দোয়াটি নিয়মিত পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া জরুরি। আ তাহলো-
হজরত
আবু
হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু
বলেন,
একদিন
হজরত
আবু
বকর
রাদিয়াল্লাহু আনহু
বললেন,
‘হে
আল্লাহর রাসুল!
আমাকে
এমন
একটি
দোয়া
কথা
বলুন,
যা
আমি
সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করব। তখন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া
সাল্লাম বললেন,
তুমি
বল-
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা
আলিমাল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি ফাত্বিরাস
সামাওয়াতি ওয়াল আরদি রাব্বা কুল্লি শাইয়িন ওয়া মালিকিহ, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আংতা আউজুবিকা
মিন শাররি নাফসি ওয়া মিন শাররি শায়ত্বানি ওয়া শিরকিহি।’
অর্থ : হে আল্লাহ! (আপনি) দৃশ্য-অদৃশ্য সব বিষয় অবগত; আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা; প্রত্যেক বস্তুর প্রতিপালক ও মালিক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই- আমার মনের (নফসের) অনিষ্টতা থেকে, শয়তানের অনিষ্টতা থেকে এবং শিরক থেকে।’- এ দোয়াটি সকাল-সন্ধ্যায় এবং শয্যায় (ঘুমাতে) যাওয়ার সময়ও বলবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে তার অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব কিছু থেকে শিরকমুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ফাআসা-বাহুম ছাইযিআ-তুমা-কাছাবু ওয়াল্লাযীনা জালামূমিন হাউলাই ছাইউসীবুহুম ছাইয়িআ-তুমা-কাছাকূ ওযা মা-হুম বিমুজিঝীন।
তাদেরকে বিপদে ফেলেছে, এদের মধ্যেও যারা পাপী, তাদেরকেও অতি সত্বর তাদের দুষ্কর্ম বিপদে ফেলবে। তারা তা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।
শিরক্- শিরক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশীস্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা।ইংরেজীতে Poytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।
মানব জীবনে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে শিরক। আল্লাহ পাক বলেন- আর্থাৎ, নিশ্চয় শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপরাধ।(সূরা লোক্বমান; ১৩)
কুরআনে বলা হয়েছে,
"আর তুমি যদি জিজ্ঞাসা কর, আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা (মুশরিকরা) অবশ্যই বলবে, মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই কেবল এগুলো সৃষ্টি করেছেন।" "তাদের অধিকাংশ আল্লাহ্-র প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (উপাসনায়) শির্ক করা অবস্থায়।" ( আয যুখরুখ - আয়াত ৫ )
"তাদের অধিকাংশ আল্লাহ্-র প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (উপাসনায়) শির্ক করা অবস্থায়।" ... আর যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা কেবল এজন্যই তাদের উপাসনা করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্-র নিকটবর্তী করে দেবে।
অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে। (সুরা ইউুসুফ 106)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হলো, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন,“ তুমি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করবে; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক্ করবে না।” (সূরা, নিসা-৪:৩৬)
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম – শিরক শব্দের অর্থ কি? শিরক আরবী শব্দ; যার আভিধানিক অর্থ শরিক, অংশীদার, সমকক্ষ, সামঞ্জস্য; পারিভাষিক অর্থে আল্লাহ তায়ালা কোরআন ও সহীহ হাদিসের মাধ্যমে আমাদেরকে তার নিজের নাম ও গুণাবলী সমূহের যে বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন সেগুলোর কোন ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদার করা বা সমকক্ষ করা বা সামঞ্জস্য করার নামই শিরক। শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ যা তওবা ছাড়া ক্ষমা হবে না।
শিরক হচ্ছে তাওহীদের বিপরীত। আল্লাহ তায়ালার সমস্ত নাম ও গুনাবলীর ব্যাপারে তার এককত্বই হচ্ছে তাওহীদ।
তাওহীদ একটি বাস্তব ও সত্য অবস্থার নাম। তাওহীদ মেনে চললে হয় ইবাদত আর তাওহীদ মেনে না চললে অর্থাৎ শিরক করলে হয় কুফর।
তাওহীদ প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, যথা:
(এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
(দুই) আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা (তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত)। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(তিন) আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা (তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত)। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
শিরক কত প্রকার ও কিকি?
শিরক ছোট ও বড় এই দুই ভাগে বিভক্ত করা সমীচিন নয়। শিরক তো শিরকই তা ছোট হোক বা বড়: ছোট এবং বড় এই দুইভাগে বিভক্ত করার কারণেই মনে হয় যেন আজ মুসলিমরা কথিত ছোট শিরককে পাপই মনে করছে না: তা থেকে বিরত থাকার কোন গুরুত্বই যেন তাদের নেই: ভাবছে ছোট শিরক কোন সমস্যা নেই: কিন্তু শিরক ছোট হোক বা বড় উভয়ই ভয়াবহ পাপ যা থেকে বিরত থাকা জরুরী।
শিরক করলে তা হয় কুফর। আর কুফরের বিভিন্ন রুপ রয়েছে। রূপভেদে কুফর ছোট বড় হতে পারে।
কিন্তু উভয়ই ভয়াবহ ক্ষতির কারন।
মানুষের মধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক আছে যারা আল্লাহকে স্বীকার করে না: মূলত তারা মনের পূজারী : তাই তারা মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত। এই অল্প কিছু সংখ্যক নাস্তিক ছাড়া সবাই আল্লাহকে স্বীকার করে: আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা রিযিকদাতা, তিনি ক্ষমতাবান এসব স্বীকার করে এবং তার ইবাদাতও করে: কিন্তু মূল সমস্যা এখানে যে, তারা অন্যকে এসব ব্যাপারে আল্লাহর সাথে অংশীদার করে : আবার কখনও আল্লাহর সৃষ্টিকে তার সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে করে। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে স্বীকার করত, কিন্তু তারা মনে করত যে, আমরা অধম গুনাহগার বান্দা, তাই আল্লাহ আমাদের প্রাথনা কবুল করবেন না। তাই তারা বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করত: যেন তারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাদের জন্য। আর সেই অসীলায় যেন আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলিদের মধ্যেও সেই অন্ধত্ব বিরাজমান। একদল মুসলিম যারা পীর ও মাজারকে পূজা করছে। যেন তারা অসীলা হতে পারে, সুপারিশকারী হতে পারে আল্লাহর নিকটে যেমন মক্কার মুশরিকরা করত।
মানুষ আল্লাহকে স্বীকার করলেও আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে না। রবুবিয়্যাতের ব্যাপারে আল্লাহর একত্ববাদ মেনে নিলেও বেশীরভাগ মানুষ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একাত্ববাদ মেনে নেয় না। অর্থাৎ কিছু বিষয়ে আল্লাহকে মান্য করলেও কতক বিষয় অমান্য করে। তাই তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। শিরককে মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা ঠিক নয়। যেমন শিরকে রবুবিয়্যঅত, শিরকে উলহিয়্যাত, শিরকে আসমা ওয়া সিফাত।
আল্লাহর নাম ও গুনাবলী সমূহকে সঠিকভাবে বোঝার মাধ্যমে তার পরিচয় জানতে পারলেই তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা যাবে তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই , এ বাক্যের মূল অর্থ বুঝা যাবে। আর তখনই শিরককে ভালভাবে বুঝতে পারা যাবে। তই আমাদেরকে প্রথমে আল্লাহর পরিচয় ভালভাবে জানতে হবে। তবেই শিরককে চিনতে পারব।
মুশরিক কারা ? যারা কোরআন ও সহীহ হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর নাম ও গুনাবলী সমূহের কোন ব্যাপারে আল্লার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক ও অংশীদার করে বা সমকক্ষ করে বা সামঞ্জস্য করে তারাই মুশরিক। হতে পারে তা অন্তরের বিশ্বাসে বা কথায় বা কাজে। যারা মুশরিক অবস্থায় মারা যাবে আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং তারা চিরকাল জাহান্নামে বসবাস করবে।
শিরক শব্দের পারিভাষিক পরিচিতি-
• “শরীয়তের পরিভাষায় যেসব গুনাবলী কেবল আল্লাহ্র জন্য নির্ধারিত সেসব গুনে অন্য কাউকে গুনান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারো অংশ আছে বলে মনে করাই শিরক্।”
• “শিরক্ হচ্ছে বান্দাহ্ আল্লাহর সাথে তাঁর রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত কর্ম কিংবা তাঁর জাত ও আসমা ওয়াস সিফাতে তথা নাম ও গুনাবলী অথবা উলুহিয়্যাতে (ইবাদতে) কাউকে শরীক করা”। (মিরাসিল আম্বিয়া, পৃঃ ৮)
• শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়ে সমকক্ষ স্থির করা যেটা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো নিকট আশা করা, আল্লাহর চাইতে অন্য কাউকে বেশী ভালবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের কোন একটি অন্যের দিকে সম্বোধন করাকে শিরক্ বলে।
• তাওহীদুল্লাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের সকল বিশ্বাস, কথা ও কাজে আল্লাহর এককত্বের উপলব্দি ও মেনে চলা। পক্ষান্তরে শিরক্ হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
• ইমাম কুরতুবী বলেন, শিরক্ হল আল্লাহর নিরংকুশ প্রভূত্বে কারো অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা।
• আক্বীদার পরিভাষায়, শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট ও সীমাবদ্ধ কোন বিষয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা।
• “শিরকের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, এতে দু‘শরীকের অংশ সমান হওয়া আবশ্যক নয়। বরং শতভাগের একভাগের অংশীদার হলেও তাকে অংশীদার বলা হয়। তাই আল্লাহতা‘য়ালার হকের সামান্যতম অংশ অন্যকে দিলেই তা শিরকে পরিণত হবে।এতে আল্লাহর অংশটা যতই বড় রাখা হোক না কেন।”
ছোট শিরক: আর তা হলো (সামান্য) লোক দেখানোর নিয়তে নেক কাজ করা। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “সুতরাং যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক কাজ করে এবং তাঁর প্রভুর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে শরিক না করে।” [সূরা আল-কাহ্ফ: ১১০]
গোপন (সূক্ষ্ম) শিরক: এর প্রমাণ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী : “এ [মুসলিম] জাতির মধ্যে শিরক অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরের উপর কালো পিপড়ার বেয়ে উঠার মতই সূক্ষ্ম বা গোপন।”
শিরক্ করলে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম অবধারিত-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “হে বনী ইসরাইল! তোমরা আমার রব এবং তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর। কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম।” (সূরা, মায়েদা-৫:৭২)
রাসুল (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে।” (মুসলিম)
শিরক্ করলে সব আমল বাতিল হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই এই ওহী হয়েছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক্ করলে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থ।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
সূরা আনফালের ৮৩-৮৭ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা ১৮ জন নবীর নাম নিয়ে তাদের ব্যাপারে বলেছেন-
“এটি আল্লাহর হেদায়েত, নিজ বান্দাহদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এটি দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শিরক্ করতো তবে তাদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত।” (সূরা, আন‘আম-৬:৮৮)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা আরও বলেনঃ “আমি তাদের আমলের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনায় পরিণত করে দেব।” (সূরা, ফোরক্বান-২৫:২৩)
শিরক্ করলে কাফের-মুশরিকে পরিণত হয়ে যায়-
ঈমান আনার পরেও কেউ
যদি আল্লাহর সাথে শিরক্ করে
তবে সে কাফের এবং
মুশরিক হয়ে যায়। ইসলামী
শরী‘য়া অনুযায়ী তাকে
‘মুর্তাদ’ বলা হয়। তার
হুদুদ (শাস্তি) মৃত্যুদন্ড। রাসুল (সঃ) বললেন-
“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও
সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত
থাক।’’ অত:পর শিরকের
কথা বললেন। অত:পর
বললেন- যে ব্যক্তি নিজের
দ্বীনকে পরিবর্তন করে(অর্থাৎ ইসলামকে
ত্যাগ করে) তাকে হত্যা
কর।” (বুখারী, আহমাদ, কবীরা গুনাহ-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার পৃঃ৭)
আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“যদি তোমরা তাদের (মুশরিকদের)
কথামত চল তবে তোমরা
অবশ্যই মুশরিক হবে।” (সূরা,
আন‘আম ৬ঃ১২১)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবতানাহু
ওয়াতা‘য়ালা মুসলিমদেরকে সাবধান
করে দিয়েছেন যদি তারা মুশরিকদের
আক্বীদা-বিশ্বাস, কাজ-কর্মে আনুগত্য
করে তাহলে তারা মুশরিক
হয়ে যাবে।
শিরক থেকে বাঁচার দোয়া:
অর্থাৎ : “হে আল্লাহ আমি জেনে-শুনে তোমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আর আমার অজ্ঞাত গুনাহরাজি থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।”
একত্ববাদের তাৎপর্য ও গুরুত্ব
সব সদ্গুণাবলির অধিকারী ও সর্বশক্তির আধার অবশ্যম্ভাবী সত্তা, যিনি অনাদি অনন্ত, যাঁর শুরু নেই, শেষ নেই, লয়-ক্ষয় ও পরিবর্তন নেই, কিছুই ছিল না, তিনি ছিলেন, সবকিছু ফানা হয়ে যাবে, তিনি থাকবেন, তিনি সব সৃষ্টির খালিক ও মালিক, সৃজন, লালন-পালন, সংরক্ষণ ও ধ্বংস সাধন যাঁর এখতিয়ার, সেই অদ্বিতীয় সত্তার নাম ‘আল্লাহ’। কোরআনে কারিমে সুরা ফাতিহার সূচনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের পরিচয় ও পরিচিতি প্রদান করেছেন। ‘আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা! যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু, যিনি কর্মফল দিবসের মালিক।’ (সুরা-১ ফাতিহা, আয়াত: ১-৩)।
আল্লাহ তাআলার গুণাবলি বিবেচনায় তাঁর বহু নাম রয়েছে, যা ‘ইসমে সিফাত’ বা গুণবাচক নাম। এগুলোকে ‘আসমাউল হুসনা’ বলা হয়। কোরআন মাজিদে রয়েছে: ‘আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ। তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো।’ (সুরা-৭ আরাফ, আয়াত: ১৮০)। ‘তোমরা আল্লাহ নামে ডাকো অথবা রহমান নামে তাঁকে ডাকো (যে নামেই ডাকো তিনি সাড়া দেবেন)। তাঁর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১১০)।
আল্লাহকে বিশ্বাস করা মানেই হলো তাঁর জাত ও সিফাত (সত্তা ও গুণাবলি) বিশ্বাস করা। ইমানে মুজমালে উপরিউক্ত বিষয়টি পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। যথা: ‘আমি ইমান আনলাম তথা বিশ্বাস করলাম আল্লাহর প্রতি, যেমন যেরূপ আছেন তিনি তাঁর নামাবলি ও গুণাবলিসহ। এবং আমি মেনে নিলাম তাঁর সকল আদেশাবলি ও নিষেধাবলি।’
তাওহিদ বা একত্ববাদ
ইসলামি বিশ্বাসের মৌলিক তিনটি বিষয় হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত। এর মধ্যে তাওহিদ হলো প্রধান ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্পর্যমণ্ডিত। সব নবী–রাসুল (আ.)–গণের কালিমা বা প্রচারের মূলমন্ত্র ছিল এই তাওহিদেরই মর্মবাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’। অর্থাৎ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’। দ্বিতীয় অংশে হলো যুগের নবী–রাসুলের পরিচয় ও স্বীকৃতির ঘোষণা। যেমন ‘আদামু ছফিয়ুল্লাহ’ (আদম আ. আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত), ‘নূহুন নাজিয়ুল্লাহ’ (নূহ আ. আল্লাহ কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত), ‘ইবরাহিমু খলিলুল্লাহ’ (ইবরাহিম আ. আল্লাহর খলিল বা বন্ধু), ‘দাউদু খলিফাতুল্লাহ’ (দাউদ আ. আল্লাহর খলিফা), ‘মুসা কালিমুল্লাহ’ (মুসা আ. আল্লাহর কালামপ্রাপ্ত), ঈসা রুহুল্লাহ’ (ঈসা আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রুহ), ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসুল)। লক্ষণীয়, কালিমার দ্বিতীয় অংশ রিসালাতের বিবরণ আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত যুগে যুগে পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কালিমার প্রথম অংশ তাওহিদ তথা আল্লাহর জাত ও সিফাতের (সত্তা ও গুণাবলি) বিবৃতি কোনোরূপ পরিবর্তিত হয়নি।
তাওহিদ ও শিরক
তাওহিদের বিপরীত হলো শিরক। শিরক অর্থ শরিক বা অংশীদার স্থির করা। ইসলামি পরিভাষায় শিরক হলো আল্লাহর জাত (সত্তা), সিফাত (গুণাবলি) ও ইবাদত (আনুগত্যে) কোনো কাউকে সমকক্ষ, শরিক বা অংশীদার, হকদার তথা উপযুক্ত মনে করা। মহাজ্ঞানী লুকমান (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তানকে শিরক বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন: ‘হে আমার স্নেহের পুত্র! তুমি আল্লাহর সাথে শরিক করবে না, নিশ্চয়ই শিরক মহা অন্যায়।’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত: ১৩)।
তাওহিদ ফিয্যাত
আল্লাহ এক, একক, অদ্বিতীয়, অবিভাজ্য। তিনি ‘লা শরিক’ অংশীবিহীন। কোরআন মাজিদে সুরা তাওহিদে এই বিষয়ের পরিপূর্ণ বিবরণের সারসংক্ষেপ বিবৃত হয়েছে। ‘বলো, আল্লাহ একক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (স্বনির্ভর), তিনি জনকও নন এবং তিনি জাতও নহেন, আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।’ (সুরা-১১২ ইখলাস, আয়াত: ১-৪)।
তাওহিদ ফিছিছফাত
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ‘সিফাতে কামাল’ বা পরিপূর্ণ গুণাবলির অধিকারী। সৃষ্টির গুণ বা বৈশিষ্ট্য অসম্পূর্ণ। এর ব্যতিক্রম বিশ্বাস হলো ‘শিরক ফিছিছফাত’ অর্থাৎ কোনো কাউকে কোনো গুণে বা বৈশিষ্ট্যে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা সমান্তরাল ভাবা হলো ‘শিরক ফিছিছফাত’।
তাওহিদ ফিল ইবাদত
ইবাদত তথা আনুগত্যে ও উপাসনায় তাঁর কোনো শরিক নেই। মহাগ্রন্থ আল–কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘বলো, হে অবিশ্বাসীরা! আমি সেসবের ইবাদত করি না, যেসবের উপাসনা তোমরা করো। এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, আমি যাঁর ইবাদত করি। আর আমিও ইবাদতকারী নই তাদের, যাদের তোমরা উপাসনা করো। এবং তোমরাও ইবাদতকারী নও তাঁর, যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমরা তোমাদের দীন (কর্মফল) ভোগ করবে, আর আমি আমার দীন (পরিণতি) লাভ করব।’ (সুরা-১০৯ কাফিরুন, আয়াত: ১-৬)। এর ব্যত্যয় হলো ‘শির্ক ফিল ইবাদাত’ অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে শরিক করা।
হয়েছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক্ করলে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থ।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
শিরক্- শিরক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশীস্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা।ইংরেজীতে Poytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।
মানব জীবনে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে শিরক। আল্লাহ পাক বলেন- আর্থাৎ, নিশ্চয় শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপরাধ।(সূরা লোক্বমান; ১৩)
কুরআনে বলা হয়েছে,
"আর তুমি যদি জিজ্ঞাসা কর, আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা (মুশরিকরা) অবশ্যই বলবে, মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই কেবল এগুলো সৃষ্টি করেছেন।" "তাদের অধিকাংশ আল্লাহ্-র প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (উপাসনায়) শির্ক করা অবস্থায়।" ( আয যুখরুখ - আয়াত ৫ )
"তাদের অধিকাংশ আল্লাহ্-র প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (উপাসনায়) শির্ক করা অবস্থায়।" ... আর যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা কেবল এজন্যই তাদের উপাসনা করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্-র নিকটবর্তী করে দেবে।
অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে। (সুরা ইউুসুফ 106)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হলো, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন,“ তুমি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করবে; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক্ করবে না।” (সূরা, নিসা-৪:৩৬)
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম – শিরক শব্দের অর্থ কি? শিরক আরবী শব্দ; যার আভিধানিক অর্থ শরিক, অংশীদার, সমকক্ষ, সামঞ্জস্য; পারিভাষিক অর্থে আল্লাহ তায়ালা কোরআন ও সহীহ হাদিসের মাধ্যমে আমাদেরকে তার নিজের নাম ও গুণাবলী সমূহের যে বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন সেগুলোর কোন ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদার করা বা সমকক্ষ করা বা সামঞ্জস্য করার নামই শিরক। শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ যা তওবা ছাড়া ক্ষমা হবে না।
শিরক হচ্ছে তাওহীদের বিপরীত। আল্লাহ তায়ালার সমস্ত নাম ও গুনাবলীর ব্যাপারে তার এককত্বই হচ্ছে তাওহীদ।
তাওহীদ একটি বাস্তব ও সত্য অবস্থার নাম। তাওহীদ মেনে চললে হয় ইবাদত আর তাওহীদ মেনে না চললে অর্থাৎ শিরক করলে হয় কুফর।
তাওহীদ প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, যথা:
(এক) আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা (তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত)। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা।
(দুই) আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা (তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত)। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(তিন) আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা (তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত)। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
শিরক কত প্রকার ও কিকি?
শিরক ছোট ও বড় এই দুই ভাগে বিভক্ত করা সমীচিন নয়। শিরক তো শিরকই তা ছোট হোক বা বড়: ছোট এবং বড় এই দুইভাগে বিভক্ত করার কারণেই মনে হয় যেন আজ মুসলিমরা কথিত ছোট শিরককে পাপই মনে করছে না: তা থেকে বিরত থাকার কোন গুরুত্বই যেন তাদের নেই: ভাবছে ছোট শিরক কোন সমস্যা নেই: কিন্তু শিরক ছোট হোক বা বড় উভয়ই ভয়াবহ পাপ যা থেকে বিরত থাকা জরুরী।
শিরক করলে তা হয় কুফর। আর কুফরের বিভিন্ন রুপ রয়েছে। রূপভেদে কুফর ছোট বড় হতে পারে।
কিন্তু উভয়ই ভয়াবহ ক্ষতির কারন।
মানুষের মধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক আছে যারা আল্লাহকে স্বীকার করে না: মূলত তারা মনের পূজারী : তাই তারা মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত। এই অল্প কিছু সংখ্যক নাস্তিক ছাড়া সবাই আল্লাহকে স্বীকার করে: আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা রিযিকদাতা, তিনি ক্ষমতাবান এসব স্বীকার করে এবং তার ইবাদাতও করে: কিন্তু মূল সমস্যা এখানে যে, তারা অন্যকে এসব ব্যাপারে আল্লাহর সাথে অংশীদার করে : আবার কখনও আল্লাহর সৃষ্টিকে তার সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে করে। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে স্বীকার করত, কিন্তু তারা মনে করত যে, আমরা অধম গুনাহগার বান্দা, তাই আল্লাহ আমাদের প্রাথনা কবুল করবেন না। তাই তারা বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করত: যেন তারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাদের জন্য। আর সেই অসীলায় যেন আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলিদের মধ্যেও সেই অন্ধত্ব বিরাজমান। একদল মুসলিম যারা পীর ও মাজারকে পূজা করছে। যেন তারা অসীলা হতে পারে, সুপারিশকারী হতে পারে আল্লাহর নিকটে যেমন মক্কার মুশরিকরা করত।
মানুষ আল্লাহকে স্বীকার করলেও আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে না। রবুবিয়্যাতের ব্যাপারে আল্লাহর একত্ববাদ মেনে নিলেও বেশীরভাগ মানুষ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একাত্ববাদ মেনে নেয় না। অর্থাৎ কিছু বিষয়ে আল্লাহকে মান্য করলেও কতক বিষয় অমান্য করে। তাই তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। শিরককে মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা ঠিক নয়। যেমন শিরকে রবুবিয়্যঅত, শিরকে উলহিয়্যাত, শিরকে আসমা ওয়া সিফাত।
আল্লাহর নাম ও গুনাবলী সমূহকে সঠিকভাবে বোঝার মাধ্যমে তার পরিচয় জানতে পারলেই তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা যাবে তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই , এ বাক্যের মূল অর্থ বুঝা যাবে। আর তখনই শিরককে ভালভাবে বুঝতে পারা যাবে। তই আমাদেরকে প্রথমে আল্লাহর পরিচয় ভালভাবে জানতে হবে। তবেই শিরককে চিনতে পারব।
মুশরিক কারা ? যারা কোরআন ও সহীহ হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর নাম ও গুনাবলী সমূহের কোন ব্যাপারে আল্লার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক ও অংশীদার করে বা সমকক্ষ করে বা সামঞ্জস্য করে তারাই মুশরিক। হতে পারে তা অন্তরের বিশ্বাসে বা কথায় বা কাজে। যারা মুশরিক অবস্থায় মারা যাবে আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং তারা চিরকাল জাহান্নামে বসবাস করবে।
শিরক শব্দের পারিভাষিক পরিচিতি-
• “শরীয়তের পরিভাষায় যেসব গুনাবলী কেবল আল্লাহ্র জন্য নির্ধারিত সেসব গুনে অন্য কাউকে গুনান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারো অংশ আছে বলে মনে করাই শিরক্।”
• “শিরক্ হচ্ছে বান্দাহ্ আল্লাহর সাথে তাঁর রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত কর্ম কিংবা তাঁর জাত ও আসমা ওয়াস সিফাতে তথা নাম ও গুনাবলী অথবা উলুহিয়্যাতে (ইবাদতে) কাউকে শরীক করা”। (মিরাসিল আম্বিয়া, পৃঃ ৮)
• শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়ে সমকক্ষ স্থির করা যেটা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো নিকট আশা করা, আল্লাহর চাইতে অন্য কাউকে বেশী ভালবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের কোন একটি অন্যের দিকে সম্বোধন করাকে শিরক্ বলে।
• তাওহীদুল্লাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের সকল বিশ্বাস, কথা ও কাজে আল্লাহর এককত্বের উপলব্দি ও মেনে চলা। পক্ষান্তরে শিরক্ হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
• ইমাম কুরতুবী বলেন, শিরক্ হল আল্লাহর নিরংকুশ প্রভূত্বে কারো অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা।
• আক্বীদার পরিভাষায়, শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট ও সীমাবদ্ধ কোন বিষয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা।
• “শিরকের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, এতে দু‘শরীকের অংশ সমান হওয়া আবশ্যক নয়। বরং শতভাগের একভাগের অংশীদার হলেও তাকে অংশীদার বলা হয়। তাই আল্লাহতা‘য়ালার হকের সামান্যতম অংশ অন্যকে দিলেই তা শিরকে পরিণত হবে।এতে আল্লাহর অংশটা যতই বড় রাখা হোক না কেন।”
ছোট শিরক: আর তা হলো (সামান্য) লোক দেখানোর নিয়তে নেক কাজ করা। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “সুতরাং যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক কাজ করে এবং তাঁর প্রভুর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে শরিক না করে।” [সূরা আল-কাহ্ফ: ১১০]
গোপন (সূক্ষ্ম) শিরক: এর প্রমাণ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী : “এ [মুসলিম] জাতির মধ্যে শিরক অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরের উপর কালো পিপড়ার বেয়ে উঠার মতই সূক্ষ্ম বা গোপন।”
শিরক্ করলে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম অবধারিত-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “হে বনী ইসরাইল! তোমরা আমার রব এবং তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর। কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম।” (সূরা, মায়েদা-৫:৭২)
রাসুল (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে।” (মুসলিম)
শিরক্ করলে সব আমল বাতিল হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই এই ওহী হয়েছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক্ করলে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থ।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
সূরা আনফালের ৮৩-৮৭ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা ১৮ জন নবীর নাম নিয়ে তাদের ব্যাপারে বলেছেন-
“এটি আল্লাহর হেদায়েত, নিজ বান্দাহদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এটি দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শিরক্ করতো তবে তাদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত।” (সূরা, আন‘আম-৬:৮৮)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা আরও বলেনঃ “আমি তাদের আমলের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনায় পরিণত করে দেব।” (সূরা, ফোরক্বান-২৫:২৩)
শিরক্ করলে কাফের-মুশরিকে পরিণত হয়ে যায়-
ঈমান আনার পরেও কেউ
যদি আল্লাহর সাথে শিরক্ করে
তবে সে কাফের এবং
মুশরিক হয়ে যায়। ইসলামী
শরী‘য়া অনুযায়ী তাকে
‘মুর্তাদ’ বলা হয়। তার
হুদুদ (শাস্তি) মৃত্যুদন্ড। রাসুল (সঃ) বললেন-
“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও
সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত
থাক।’’ অত:পর শিরকের
কথা বললেন। অত:পর
বললেন- যে ব্যক্তি নিজের
দ্বীনকে পরিবর্তন করে(অর্থাৎ ইসলামকে
ত্যাগ করে) তাকে হত্যা
কর।” (বুখারী, আহমাদ, কবীরা গুনাহ-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার পৃঃ৭)
আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“যদি তোমরা তাদের (মুশরিকদের)
কথামত চল তবে তোমরা
অবশ্যই মুশরিক হবে।” (সূরা,
আন‘আম ৬ঃ১২১)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবতানাহু
ওয়াতা‘য়ালা মুসলিমদেরকে সাবধান
করে দিয়েছেন যদি তারা মুশরিকদের
আক্বীদা-বিশ্বাস, কাজ-কর্মে আনুগত্য
করে তাহলে তারা মুশরিক
হয়ে যাবে।
শিরক থেকে বাঁচার দোয়া:
অর্থাৎ : “হে আল্লাহ আমি জেনে-শুনে তোমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আর আমার অজ্ঞাত গুনাহরাজি থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।”
একত্ববাদের তাৎপর্য ও গুরুত্ব
সব সদ্গুণাবলির অধিকারী ও সর্বশক্তির আধার অবশ্যম্ভাবী সত্তা, যিনি অনাদি অনন্ত, যাঁর শুরু নেই, শেষ নেই, লয়-ক্ষয় ও পরিবর্তন নেই, কিছুই ছিল না, তিনি ছিলেন, সবকিছু ফানা হয়ে যাবে, তিনি থাকবেন, তিনি সব সৃষ্টির খালিক ও মালিক, সৃজন, লালন-পালন, সংরক্ষণ ও ধ্বংস সাধন যাঁর এখতিয়ার, সেই অদ্বিতীয় সত্তার নাম ‘আল্লাহ’। কোরআনে কারিমে সুরা ফাতিহার সূচনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের পরিচয় ও পরিচিতি প্রদান করেছেন। ‘আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা! যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু, যিনি কর্মফল দিবসের মালিক।’ (সুরা-১ ফাতিহা, আয়াত: ১-৩)।
আল্লাহ তাআলার গুণাবলি বিবেচনায় তাঁর বহু নাম রয়েছে, যা ‘ইসমে সিফাত’ বা গুণবাচক নাম। এগুলোকে ‘আসমাউল হুসনা’ বলা হয়। কোরআন মাজিদে রয়েছে: ‘আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ। তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো।’ (সুরা-৭ আরাফ, আয়াত: ১৮০)। ‘তোমরা আল্লাহ নামে ডাকো অথবা রহমান নামে তাঁকে ডাকো (যে নামেই ডাকো তিনি সাড়া দেবেন)। তাঁর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১১০)।
আল্লাহকে বিশ্বাস করা মানেই হলো তাঁর জাত ও সিফাত (সত্তা ও গুণাবলি) বিশ্বাস করা। ইমানে মুজমালে উপরিউক্ত বিষয়টি পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। যথা: ‘আমি ইমান আনলাম তথা বিশ্বাস করলাম আল্লাহর প্রতি, যেমন যেরূপ আছেন তিনি তাঁর নামাবলি ও গুণাবলিসহ। এবং আমি মেনে নিলাম তাঁর সকল আদেশাবলি ও নিষেধাবলি।’
তাওহিদ বা একত্ববাদ
ইসলামি বিশ্বাসের মৌলিক তিনটি বিষয় হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত। এর মধ্যে তাওহিদ হলো প্রধান ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্পর্যমণ্ডিত। সব নবী–রাসুল (আ.)–গণের কালিমা বা প্রচারের মূলমন্ত্র ছিল এই তাওহিদেরই মর্মবাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’। অর্থাৎ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’। দ্বিতীয় অংশে হলো যুগের নবী–রাসুলের পরিচয় ও স্বীকৃতির ঘোষণা। যেমন ‘আদামু ছফিয়ুল্লাহ’ (আদম আ. আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত), ‘নূহুন নাজিয়ুল্লাহ’ (নূহ আ. আল্লাহ কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত), ‘ইবরাহিমু খলিলুল্লাহ’ (ইবরাহিম আ. আল্লাহর খলিল বা বন্ধু), ‘দাউদু খলিফাতুল্লাহ’ (দাউদ আ. আল্লাহর খলিফা), ‘মুসা কালিমুল্লাহ’ (মুসা আ. আল্লাহর কালামপ্রাপ্ত), ঈসা রুহুল্লাহ’ (ঈসা আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রুহ), ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসুল)। লক্ষণীয়, কালিমার দ্বিতীয় অংশ রিসালাতের বিবরণ আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত যুগে যুগে পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কালিমার প্রথম অংশ তাওহিদ তথা আল্লাহর জাত ও সিফাতের (সত্তা ও গুণাবলি) বিবৃতি কোনোরূপ পরিবর্তিত হয়নি।
তাওহিদ ও শিরক
তাওহিদের বিপরীত হলো শিরক। শিরক অর্থ শরিক বা অংশীদার স্থির করা। ইসলামি পরিভাষায় শিরক হলো আল্লাহর জাত (সত্তা), সিফাত (গুণাবলি) ও ইবাদত (আনুগত্যে) কোনো কাউকে সমকক্ষ, শরিক বা অংশীদার, হকদার তথা উপযুক্ত মনে করা। মহাজ্ঞানী লুকমান (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তানকে শিরক বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন: ‘হে আমার স্নেহের পুত্র! তুমি আল্লাহর সাথে শরিক করবে না, নিশ্চয়ই শিরক মহা অন্যায়।’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত: ১৩)।
তাওহিদ ফিয্যাত
আল্লাহ এক, একক, অদ্বিতীয়, অবিভাজ্য। তিনি ‘লা শরিক’ অংশীবিহীন। কোরআন মাজিদে সুরা তাওহিদে এই বিষয়ের পরিপূর্ণ বিবরণের সারসংক্ষেপ বিবৃত হয়েছে। ‘বলো, আল্লাহ একক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (স্বনির্ভর), তিনি জনকও নন এবং তিনি জাতও নহেন, আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।’ (সুরা-১১২ ইখলাস, আয়াত: ১-৪)।
তাওহিদ ফিছিছফাত
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ‘সিফাতে কামাল’ বা পরিপূর্ণ গুণাবলির অধিকারী। সৃষ্টির গুণ বা বৈশিষ্ট্য অসম্পূর্ণ। এর ব্যতিক্রম বিশ্বাস হলো ‘শিরক ফিছিছফাত’ অর্থাৎ কোনো কাউকে কোনো গুণে বা বৈশিষ্ট্যে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা সমান্তরাল ভাবা হলো ‘শিরক ফিছিছফাত’।
তাওহিদ ফিল ইবাদত
ইবাদত তথা আনুগত্যে ও উপাসনায় তাঁর কোনো শরিক নেই। মহাগ্রন্থ আল–কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘বলো, হে অবিশ্বাসীরা! আমি সেসবের ইবাদত করি না, যেসবের উপাসনা তোমরা করো। এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, আমি যাঁর ইবাদত করি। আর আমিও ইবাদতকারী নই তাদের, যাদের তোমরা উপাসনা করো। এবং তোমরাও ইবাদতকারী নও তাঁর, যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমরা তোমাদের দীন (কর্মফল) ভোগ করবে, আর আমি আমার দীন (পরিণতি) লাভ করব।’ (সুরা-১০৯ কাফিরুন, আয়াত: ১-৬)। এর ব্যত্যয় হলো ‘শির্ক ফিল ইবাদাত’ অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে শরিক করা।
No comments:
Post a Comment