প্রচন্ড মন খারাপে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে 'মন খারাপ কেন?' কথাটা তীরের মতো বুকে বিঁ ধে আর অজান্তেই চোখের কোনায় কয়েক ফোঁটা জল জমে; কিন্তু ব্যথাটা কাউকে বুঝনো যায় না। কথায়
আছে না, "কেউ দেখে শেখে আর কেউ ঠেকে শেখে", বর্তমানে এই কথাটার মর্ম হাড়ে
হাড়ে বুঝতে পারছি। আমি বাবা মায়ের একমাত্র কন্যাসন্তান। সেহুতু ছোটবেলা
থেকেই খুব আদর-যত্ন আর ভালোবাসায় বড় হয়েছি। আমার বাবা একজন প্রাইভেট
ব্যাঙ্ক কর্মচারী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই কোনোকিছুর অভাব আমাকে অনুভব করতে
হয়নি, আসলে অনুভব করতে দেয়নি! বাবা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের সমস্ত কাজের
চাপ, খাটনি সহ্য করেই সেই সুখ আমাদের দিয়েছিলেন। বেশ সুখ স্বাচ্ছন্দে আর
পরিবারের ভালোবাসায় আমার দিন কাটছিল।
কিন্তু কিছু মাস আগেই বাবার একটা
অ্যাক্সিডেন্ট হয়! কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত কোনো সাড় নেই, একেবারে
বিছানা সজ্জা। সুতরাং কাজটা থাকারও কোনো চান্স নেই। ব্যাস! এক ঝটকায় যেনো
আমার গোটা জীবন পুরো ওলটপালট হয়ে গেল। বাবা পরিবারের মেরুদন্ড ছিল, সেটা
ভেঙে যাওয়ায় যেন আকাশ থেকে মাটিতে পুরো আছাড় খেয়ে পড়লাম। সংসারে শুরু
হল আর্থিক অনটন। ধীরে ধীরে বাবার চিকিৎসায়, জমানো সবটুকু চলে গেল।
মা
সবসময় আফশোস করতো কোনো কাজ করে না বলে, অনেকবার কাজ খুঁজেছে, পেয়েও ছিল
ছোটোখাটো। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমাকে যখন পড়াশোনা শিখিয়েছো, তখন আমি
তোমাদের পাশে দাঁড়াবো, তুমি শুধু বাবার খেয়াল রাখো।
আমি দু-তিনটে টিউশন করতাম, স্যার-ম্যাডাম আর বন্ধুদের সাহায্যে আমি গ্ৰাজুয়েশনটা পাশ করি, আর তারপর শুরু হল আসল যুদ্ধ।
কখনো
তো ভাবিনি মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া চলে যাবে, বাইরের দুনিয়াটা যে কত
কঠিন, আর হিংস্র ধীরে ধীরে বুঝতে শিখি। বর্তমানে সামান্য গ্ৰাজুয়েশন দিয়ে
যে চাকরি পাওয়া কতটা কঠিন, সেটা শুধু ওই রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ছুটতে
থাকা মানুষগুলো জানে! সেখানে কোনো লিঙ্গ বৈষম্য নেই। সবাই চায় একটু
অর্থের সম্বল। আর ভালো চাকরি পেতে গেলে টাকা খরচ করে দামী দামী কোর্স করতে
হবে, যেটা সবার সামর্থ্য নয়।
কিন্তু নারীদের জন্য এই চেষ্টা তো বরাবরই
একটু কঠিন, তাদের তো কাজের সাথে সাথে নিজের সম্মানটাও বাঁচাতে হয়। আমি-ও
অনেক লড়াই করেছি, কিন্তু বাড়িতে এসে মাকে কোনোদিন বলতে পারিনি সেসব,
নিজের মধ্যে সবকিছু চেপে রেখে নিজেকে পাথরে পরিণত করেছি। অনেক কষ্টে একটা
কাজ জোগাড় করতে পেরেছি, সেটুকুই শান্তি।
মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেদের যেমন
লড়াই একটা চাকরি নিয়ে, সেই লড়াই অনেক মেয়েদেরও করতে হয়। ট্রেনের
লেডিস কামরায় ওরাও রোজ ক্লান্ত হয়ে ফেরে।
অনেক নারী কাজ করে নিজের
আত্মসম্মানের জন্য, কারো ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার জন্য। আবার অনেকে আছে
যারা কাজ শেষে বাড়িতে বাবার ওষুধটা, ঘরের মুদিখানা বাজার, ছেলে-মেয়ের
পড়ার বই নিয়ে ফেরে। কারো ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা তাদের মাথাতেই আসে না,
কারণ নির্ভরশীল হওয়ার মতো তাদের পাশে কেউ থাকেই না।
লড়াইটা সবার একই! সেটা হল পয়সা উপার্জন। শুধু কারণ হয়তো একটু আলাদা!
Saturday, January 21, 2023
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment