বাগিচায় বুলবুলি তুই….
ম ন সু র আ হ ম দ
তারিখ: 24 May, 2013
স্নেহধন্যা বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা এক
চিঠিতে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়;
ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা-কুসুম-ফোটা বসন্তই
পাখিকে গান গাওয়ায়, ফল পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়।’ প্রকৃতির আহ্বানে পাখির
কণ্ঠে যেমন গান ভেসে ওঠে মানুষের কণ্ঠেও তেমনি প্রকৃতি গান জাগিয়ে তোলে।
তফাৎ এতটুকু যে, পাখির গানে কোনো বৈচিত্র্য নেই কিন্তু মানুষের গানের পেছনে
কবির দৃশ্য-অন্তর্দৃশ্য কল্পনা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি সম্বন্ধে কল্পনা কাজ
করে বলে তাতে যেমন ভাবের জোয়ার-ভাটা আছে, তেমনি আছে বৈচিত্র্যে ভরপুর
সুরব্যঞ্জনা।
কবির বিভিন্ন কল্পনা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন উপমা প্রয়োগের
মাধ্যমে। দেশে দেশে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকেরা তাদের শিল্পকর্মকে
সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন উপমা প্রয়োগ করে। নজরুলের গানে উপমা প্রয়োগে কবি
আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এসব উপমায় প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে
অতিপ্রাকৃতিক উপাদান সংমিশ্রিত হয়ে গানকে অধিকতর সৌন্দর্যাভিসারী ও
হৃদয়গ্রাহী করেছে। যেমন কবির বিখ্যাত গান :
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল।
আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিভোল ॥
কবে সে ফুল-কুমারী ঘোমটা চিরে আসবে বাহিরে,
শিশিরের স্পর্শ সুখে ভাঙবে রে ঘুম রাঙবে রে কপোল ॥
এখানে ফুল-কুমারী, ফুলকলি প্রতীক ও উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু উপমেয় ঘোমটার আড়ালেই রয়ে গেছে।
নদীর জল যেমন সাগরমুখী হয়ে সাগর জলে স্বচ্ছ হয়, তেমনি কবির কণ্ঠে সুর
সমন্বয় সঙ্গীত নানা উপমা নিয়ে ইসলামি স্রোতধারায় মিশে তাঁর গানকে স্ফটিক
স্বচ্ছ ও মূল্যবান করেছে। যেমন একটি গানে কবি বলেছেন,
মোর অন্তরেরই হেরা গুহায়
আজও তোমার ডাক শোনা যায়
জাগে আমার প্রেমের কাবা ঘরে
তোমারি সুরত ॥
কবি এখানে তাঁর অন্তরকে রূপকধর্মী উপমারূপে হেরাগুহা ও কাবাঘরকে বেছে
নিয়েছেন। নজরুলের হৃদয়ে কাবা পাকাপোক্তভাবে আসন করে নিয়ে ছিল বলে বারবার
তাঁর কবিতা-গানে বিভিন্নরূপে কাবা এসেছে। তিনি গেয়েছেন,
বক্ষে আমার কাবার ছবি
চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।
কাবার জিয়ারতে তুমি কে যাও মদিনায়
আমার সালাম পৌঁছে দিও নবীজীর রওজায়।
দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে।
বেহোঁশ হয়ে চলছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে
উৎপীড়িতের লোনা আঁসু জলে ডুবে গেল কত কাবা
কত উজ তাতে ডুবে মল হায় কত নুহ হল তাবা।
আজ কি আবার কাবার পথে
ভিড় জমেছে প্রভাত হতে।
বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে কবি উপমা ব্যবহার করে তাঁর গানকে সুন্দর ও
মূল্যবান করেছেন। যেমন তিনি মা আমেনার কোলের উপমা হিসেবে ঊষার কোলকে গ্রহণ
করেছেন। একটি গজলে তিনি গেয়েছেনÑ
তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।
মহানবীর আবির্ভাবে মরুপ্রান্তরে যে আনন্দের বান বয়েছিল, তা বর্ণনা করতে
গিয়ে কবি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের উপমা হাজির করেছেন তাঁর গানে। যেমনÑ
লু হাওয়া বাজায় সারেঙ্গী বীণ
খেজুর পাতার তারে
বালুর আবীর ছুড়ে ছুড়ে মারে
স্বর্গে গগন পারে।
কবি কখনো নবীর উপমা খুঁজেছেন রবির মাঝে। যেমনÑ
পুরাতন রবি উঠিল না আর
সেদিন লজ্জা পেয়ে
নবীন রবির আলোকে সেদিন
বিশ্ব উঠিল ছেয়ে।
আবার কখনো কবি রসূলের উপমা করেছেন চাঁদের সনে। যেমনÑ
নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া
কে এলো মক্কায় আমেনার কোলে
ফাগুন-পূর্ণিমা-নিশিতে যেমন
আসমানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে॥
তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।
হজরতের তিরোভাবে শোকবিহ্বল বিশ্বপ্রকৃতির বেদনাকাতর রূপ কবি সুন্দরভাবে
ফুটিয়ে তুলেছেন উপমা হিসেবে মরুভূমির কান্নাকে ব্যবহার করে। যেমনÑ
আকাশে ললাট হানি কাঁদিছে মরুভূমি।
আকাশ সম্পৃক্ত আর একটি উপমা এসেছে কানন বালা দেবীর কণ্ঠে গীত ‘আকাশে
হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’ নজরুলের বিখ্যাত গানে। কবি মেঘের উপমা
দিয়েছেন পাহাড়ের সাথে। কবি কুরআন থেকে আকাশে হেলান দিয়ে পাড় ঘুমাবার
উপমা গ্রহণ করেছেন কি না, জানি না। তবে কুরআনের উপমার সাথে এ উপমার মিল
দেখে বুঝতে বাকি থাকে না যে, নজরুলের অন্তরতলে কুরআনের ভাবের ফল্গুধারা
বয়ে ছিল। এ সব গান যে স্বর্গীয় ভাবদ্যোতক তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
কবি সুফি তত্ত্বের গভীর ভাব প্রকাশে ‘অম্বর’ ও ‘ফেরদৌস’কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। যেমনÑ
নামে যার এত মধু ঝরে, তার রূপ কত মধুময়।
কোটি তারকার কীলক রুদ্ধ অম্বর দ্বার খুলে
মনে হয় তার স্বর্ণ-জ্যোতি দুলে ওঠে কুতুহলে।
ঘুম নাহি আসা নিঝ্ঝুম নিশি- পবনের নিঃশ্বাসে
ফিরদৌস আলা হতে যেন লালা ফুলের সুরভি আসে।
কবি আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে যেসব গান রচনা করেছেন তাতে রয়েছে প্রচুর উপমা। এ ধরনের একটি গানÑ
সকাল সাঝে প্রভু সকল কাজে
বেজে উঠুক তোমারই নাম।
নিশীথ রাতের তারার মত
বেজে উঠুক তোমারই নাম ॥
এই একটি গানে রয়েছে সাতটি পূর্ণোপমা। নজরুলের সব গানে উপমার এমন
প্রাচুর্য নেই বটে, তবে তাঁর শতকরা পঁচাব্বইটি গানেই উপমা বিদ্যমান, যে
কারণে নজরুলের গীতিকে বলা হয়ে থাকে পূর্ণোপমা-প্রধান গীতিকা।
দুঃসহ দারুণ দিনে কবির হৃদয়ে যে হাহাকার জাগে তা যেন মরু সাহারার প্রবল তাপে উত্তপ্ত। কবির এ উপমা খুবই ব্যঞ্জনাময়।
দুর্দিনের এই দারুণ দিনে
শরণ নিলাম পানশালায়,
হায় সাহারার প্রখর তাপে
পরাণ কাঁপে দিল কাবাব ॥
আবার এক অতুলনীয় কল্পনাবিলাসে কবি তাঁর প্রিয়তমাকে সাজাতে আসমানের চাঁদ তারা রং ধনু জেওরের উপমারূপে গানে সাজিয়েছেন। যেমনÑ
মোর প্রিয়া হবে, এস রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।
জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায়,
রামধনু হতে লাল রং ছানি’ আলতা পরাব পায়।
নজরুল তাঁর জৈব ভাবদোতক পার্থিব ভালোবাসার গানে রূপক উপমা এমনভাবে গ্রহণ
করছেন যা শ্রোতাকে মুহূর্তে স্বর্গে মর্তে বিচরণ করিয়ে আনে। যেমনÑ
‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে’, ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না
এই নয়ন পানে’ ইত্যাদি গান। এসব গান কামনা-বাসনার রূপায়ণমূলক রচনা হলেও
এসবের মধ্যে এমন সূক্ষ্মতা আছে যার আবেদন কাব্যভাবগ্রাহীর কাছেই শুধু
অমূল্য সম্পদরূপে ধরা দেয়। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে একটি গানের কিছু অংশ তুলে
দেয়া হলো যেন তারা তাতে রূপক উপমার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এ
উদ্ধৃতিতে শুধু কথার সৌন্দর্যই ধরতে পারা যাবে, সুরের সৌন্দর্য নয়, যেমনÑ
‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে।
জানিতে নাইকো বাকী সই ও আঁখি কী যাদু জানে।
একে ঐ চাউনি বাঁকা সুর্মা আঁকা তায় ডাগর আঁখি,
বাঁধতে তায় কেন সাধ, যে মেরেছে ঐ আঁখি বাণে?
কাননে হরিণ কাঁদে সলিল ফাঁদে ঝুরছে শফরি,
বাঁকায় ভূরুর ধনু ফুল অতনু-কুসুম শর হানে।’
এ গানটিতে এক প্রেমিকের প্রেমতপ্ত হৃদয়ের হতাশা মথিত কাতরোক্তি রূপক ও
উপমার জাদুতে অনবদ্য ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। এভাবে নজরুলের হাজার হাজার গানে
ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অনুপম উপমা। আমার মনে হয় উপমা প্রয়োগের ক্ষেত্রে
নজরুল সব কবিকে পেছনে ফেলেছেন। বাণীর ক্ষেত্রেও একথা সত্য!
No comments:
Post a Comment