বিজ্ঞানের বিকাশে কোরআন মজিদের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে শিল্পকলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে। বস্তুতপক্ষে কোরআন মজিদ মুসলমানদের শিল্পকলার চর্চায় উত্সাহিত করেছে। যেমন—সুন্দর সহিহভাবে কোরআন তেলাওয়াত থেকেই সুললিত উচ্চারণের একটি শাখার উদ্ভব হয়েছে। আবার কোরআন সংরক্ষণ প্রচেষ্টা থেকেই ক্যালিগ্রাফি বা সুন্দর হস্তলিখন এবং বাঁধাই শিল্পের সূত্রপাত ঘটেছে। মসজিদ নির্মাণশৈলী থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য এবং অলঙ্করণ শিল্পের।
এক সময় ধর্মীয় অনুভূতি ও উপলব্ধি থেকে যে শিল্পের উদ্ভব ঘটে, পরবর্তী সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিলাসিতা সে শিল্পকলাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে ইসলাম আত্মিক ও পার্থিব চাহিদার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করার নীতি শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সব বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার। অর্থাত্ ইসলামের হুকুম এই যে, মানুষের স্বভাবজাত প্রতিভার অবশ্যই বিকাশ ঘটাতে হবে। তবে তা হতে হবে সঠিক এবং আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে। তাকে গড়ে উঠতে হবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন (মুসলিম ও মাসনদ-ই-ইবনে হাম্বল)। অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। এমনকি তুমি যদি কাউকে হত্যা কর, তাহলে সে কাজটিও করতে হবে সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে।’ কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা (৬:৫), পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি... (১৮:৬)।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) একদিন একটি কবরস্থান দেখতে পেলেন; কিন্তু কবরস্থানটি পুরোপুরি সমান ছিল না। তখনই কবরস্থানটি সংস্কার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, কবরস্থানটি সংস্কার করার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মঙ্গল অমঙ্গলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমাদের চোখে এটা দেখতে ভালো লাগে। আল্লাহ এটা পছন্দ করেন যে, আমরা যখন কোনো কাজ করব, তখন তা অবশ্যই যথাসম্ভব সুন্দরভাবে করব। (ইবনে সা’দ)
ললিতকলার প্রতি মানুষের একটি স্বভাবজাত আকর্ষণ রয়েছে। আল্লাহ তায়াল অফুরন্ত প্রাকৃতিক নিয়ামতের মতো শিল্পকলা সম্পর্কিত প্রতিভাও একটা নিয়ামত। শিল্পকলা মানুষের জীবনাচরণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক, ইসলামে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই। এমনকি সংযমের নামে মাত্রাতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈরাগ্য ইসলামে নেই।
নবী করিম (সা.)-এর জন্য সর্বপ্রথম যে মিম্বরটি তৈরি করা হয়েছিল, তাও দুটি গোলক বা গোলাকার বস্তু দ্বারা সাজানো হয়েছিল। গোলক দুটি ছিল অনেকটা ডালিমের মতো। নবী করিম (সা.)-এর দুই প্রিয় নাতি এ গোলক দুটি দিয়ে বেশ মজা করে খেলতেন। এখান থেকেই কাঠের কারুকাজের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীকালে কোরআন মজিদের কপিগুলো নানা রঙে সুশোভিত করা হয় এবং সেগুলো বাঁধাইয়ে দারুণ যত্ন নেয়া হয়।
সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, শিল্পকলার বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না। বাধা-নিষেধ আরোপ করে থাকে শুধু প্রাণীর প্রতিকৃতি চিত্রায়ন বা নির্মাণের ক্ষেত্রে। এর পেছনেও কতগুলো যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। কারণগুলো প্রধানত মনোজগত্, সামাজিক, জীববিদ্যা ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্পর্কিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মূর্তিমান শিল্পের ব্যাপারে ইসলামে যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা কখনো মুসলমানদের শিল্পচর্চাকে ব্যাহত করতে পারেনি; বরং তাদের হাতে বিমূর্ত শিল্পচর্চার যে বিকাশ ঘটেছে তা খুবই বিস্ময়কর। কোরআন মজিদে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাজসজ্জার অনুমোদন রয়েছে (সূরা নূর : ৩৬)। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মদিনার মসজিদে নব্বী, জেরুজালেমের মসজিদ, ইস্তাম্বুলের সোলায়মানিয়া মসজিদ, আগ্রার তাজমহল, গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ এবং এ ধরনের আরো কতগুলো কীর্তির উল্লেখ করা যেতে পারে। অন্য যে কোনো সভ্যতার অসামান্য স্থাপত্যকর্ম বা শিল্প সৌকর্যের চেয়ে এগুলোকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
মুসলমানরা ছবি আঁকার পরিবর্তে ক্যালিগ্রাফিকে গ্রহণ করেছে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে। বলতে গেলে এটি তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। তারা প্রধানত অঙ্কন, কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য চিত্রায়নের কাজে ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে থাকে। যেসব ক্যালিগ্রাফি দরদ, যত্ন ও নৈপুণ্যের সঙ্গে প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর মান খুবই উন্নত। দেখতেও চমত্কার এবং মনোমুগ্ধকর। এগুলোর সৌন্দর্য সত্যিই অবর্ণনীয়।
কোরআন তেলাওয়াত মুসলমানদের শিল্পচর্চার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কোরআন তেলাওয়াতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অবকাশ নেই। কোরআনের সব আয়াতও সমান ও একই মাত্রার নয়। নবী করিম (সা.)-এর কাল থেকেই মুসলমানরা পরম আগ্রহের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে আসছেন। কোরআন মজিদে নিজস্ব একটি গতি ও ছন্দ আছে। এর আয়াতগুলো খুবই শ্রুতিমধুর ও মিষ্টি। অন্য যে কোনো ভাষার গতি ও ছন্দের মান যত উন্নত ও চিত্তাকর্ষকই হোক না কেন, তা কখনো কোরআন মজিদের মিষ্টি মধুর ম্লান করতে পারে না। যারা কস্ফারী সাহেবের তেলাওয়াত অথবা প্রতিনিয়ত মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শোনেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, এটা মুসলমানদের একটা অনন্য সম্পদ। এর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যই আলাদা। এর সঙ্গে এমন একটা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ মিশে আছে, যার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
কবিতা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, এমন কিছু কবিতা আছে যেগুলো জ্ঞানের গভীরতায় পরিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো বক্তার বক্তব্যের কার্যকারিতা একেবারেই চিত্তাকর্ষক। কোরআনুল করিমে নৈতিকতাবিরোধী কবিতাকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। কোরআনুল করিমের এই বিধানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নবী করিম (সা.) তদানীন্তন কবিদের সঠিক পথনির্দেশ দিয়েছেন। তাদের জানিয়ে দিয়েছেন তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। বলে রাখা আবশ্যক, সে আমলের শ্রেষ্ঠতম কবিরা নিয়মিত তার দরবারে আসতেন। তারা সহজেই ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারতেন। তাদের মেধাও তারা ব্যবহার করতেন যথাযোগ্যভাবে।
সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যায়, শিল্পকলার বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুন নতুন এমন অনেক বিষয় উদ্ভাবন করেন যা ছিল মানুষের চিন্তার বাইরে। অথচ এক্ষেত্রে তারা চমত্কার রুচির পরিচয় দেন এবং ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে সযত্নে পরিহার করেন। এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে :
প্রথমত অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনায়াসেই মুসলমানরা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এ অবস্থায় মুসলমানদের যদি নিজস্ব কোনো শিল্প-সংস্কৃতি না থাকত, নবী করিম (সা.) যদি মুসলমানদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতিবোধকে উজ্জীবিত না করতেন, তাহলে সহজেই তারা অমুসলমানদের সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। প্রত্যেকেই মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা করত। মুসলমানদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরত নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ফলে মুসলমানদের কখনো অন্যেরটা গ্রহণ করতে হতো না। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা তাদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলে এবং তারা এটা করে থাকে বিজ্ঞানের বিকাশ তথা মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে।
অনুবাদ : মুহাম্মদ লুত্ফুল হক
এক সময় ধর্মীয় অনুভূতি ও উপলব্ধি থেকে যে শিল্পের উদ্ভব ঘটে, পরবর্তী সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিলাসিতা সে শিল্পকলাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে ইসলাম আত্মিক ও পার্থিব চাহিদার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করার নীতি শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সব বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার। অর্থাত্ ইসলামের হুকুম এই যে, মানুষের স্বভাবজাত প্রতিভার অবশ্যই বিকাশ ঘটাতে হবে। তবে তা হতে হবে সঠিক এবং আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে। তাকে গড়ে উঠতে হবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন (মুসলিম ও মাসনদ-ই-ইবনে হাম্বল)। অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। এমনকি তুমি যদি কাউকে হত্যা কর, তাহলে সে কাজটিও করতে হবে সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে।’ কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা (৬:৫), পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি... (১৮:৬)।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) একদিন একটি কবরস্থান দেখতে পেলেন; কিন্তু কবরস্থানটি পুরোপুরি সমান ছিল না। তখনই কবরস্থানটি সংস্কার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, কবরস্থানটি সংস্কার করার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মঙ্গল অমঙ্গলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমাদের চোখে এটা দেখতে ভালো লাগে। আল্লাহ এটা পছন্দ করেন যে, আমরা যখন কোনো কাজ করব, তখন তা অবশ্যই যথাসম্ভব সুন্দরভাবে করব। (ইবনে সা’দ)
ললিতকলার প্রতি মানুষের একটি স্বভাবজাত আকর্ষণ রয়েছে। আল্লাহ তায়াল অফুরন্ত প্রাকৃতিক নিয়ামতের মতো শিল্পকলা সম্পর্কিত প্রতিভাও একটা নিয়ামত। শিল্পকলা মানুষের জীবনাচরণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক, ইসলামে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই। এমনকি সংযমের নামে মাত্রাতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈরাগ্য ইসলামে নেই।
নবী করিম (সা.)-এর জন্য সর্বপ্রথম যে মিম্বরটি তৈরি করা হয়েছিল, তাও দুটি গোলক বা গোলাকার বস্তু দ্বারা সাজানো হয়েছিল। গোলক দুটি ছিল অনেকটা ডালিমের মতো। নবী করিম (সা.)-এর দুই প্রিয় নাতি এ গোলক দুটি দিয়ে বেশ মজা করে খেলতেন। এখান থেকেই কাঠের কারুকাজের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীকালে কোরআন মজিদের কপিগুলো নানা রঙে সুশোভিত করা হয় এবং সেগুলো বাঁধাইয়ে দারুণ যত্ন নেয়া হয়।
সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, শিল্পকলার বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না। বাধা-নিষেধ আরোপ করে থাকে শুধু প্রাণীর প্রতিকৃতি চিত্রায়ন বা নির্মাণের ক্ষেত্রে। এর পেছনেও কতগুলো যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। কারণগুলো প্রধানত মনোজগত্, সামাজিক, জীববিদ্যা ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্পর্কিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মূর্তিমান শিল্পের ব্যাপারে ইসলামে যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা কখনো মুসলমানদের শিল্পচর্চাকে ব্যাহত করতে পারেনি; বরং তাদের হাতে বিমূর্ত শিল্পচর্চার যে বিকাশ ঘটেছে তা খুবই বিস্ময়কর। কোরআন মজিদে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাজসজ্জার অনুমোদন রয়েছে (সূরা নূর : ৩৬)। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মদিনার মসজিদে নব্বী, জেরুজালেমের মসজিদ, ইস্তাম্বুলের সোলায়মানিয়া মসজিদ, আগ্রার তাজমহল, গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ এবং এ ধরনের আরো কতগুলো কীর্তির উল্লেখ করা যেতে পারে। অন্য যে কোনো সভ্যতার অসামান্য স্থাপত্যকর্ম বা শিল্প সৌকর্যের চেয়ে এগুলোকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
মুসলমানরা ছবি আঁকার পরিবর্তে ক্যালিগ্রাফিকে গ্রহণ করেছে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে। বলতে গেলে এটি তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। তারা প্রধানত অঙ্কন, কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য চিত্রায়নের কাজে ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে থাকে। যেসব ক্যালিগ্রাফি দরদ, যত্ন ও নৈপুণ্যের সঙ্গে প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর মান খুবই উন্নত। দেখতেও চমত্কার এবং মনোমুগ্ধকর। এগুলোর সৌন্দর্য সত্যিই অবর্ণনীয়।
কোরআন তেলাওয়াত মুসলমানদের শিল্পচর্চার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কোরআন তেলাওয়াতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অবকাশ নেই। কোরআনের সব আয়াতও সমান ও একই মাত্রার নয়। নবী করিম (সা.)-এর কাল থেকেই মুসলমানরা পরম আগ্রহের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে আসছেন। কোরআন মজিদে নিজস্ব একটি গতি ও ছন্দ আছে। এর আয়াতগুলো খুবই শ্রুতিমধুর ও মিষ্টি। অন্য যে কোনো ভাষার গতি ও ছন্দের মান যত উন্নত ও চিত্তাকর্ষকই হোক না কেন, তা কখনো কোরআন মজিদের মিষ্টি মধুর ম্লান করতে পারে না। যারা কস্ফারী সাহেবের তেলাওয়াত অথবা প্রতিনিয়ত মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শোনেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, এটা মুসলমানদের একটা অনন্য সম্পদ। এর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যই আলাদা। এর সঙ্গে এমন একটা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ মিশে আছে, যার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
কবিতা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, এমন কিছু কবিতা আছে যেগুলো জ্ঞানের গভীরতায় পরিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো বক্তার বক্তব্যের কার্যকারিতা একেবারেই চিত্তাকর্ষক। কোরআনুল করিমে নৈতিকতাবিরোধী কবিতাকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। কোরআনুল করিমের এই বিধানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নবী করিম (সা.) তদানীন্তন কবিদের সঠিক পথনির্দেশ দিয়েছেন। তাদের জানিয়ে দিয়েছেন তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। বলে রাখা আবশ্যক, সে আমলের শ্রেষ্ঠতম কবিরা নিয়মিত তার দরবারে আসতেন। তারা সহজেই ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারতেন। তাদের মেধাও তারা ব্যবহার করতেন যথাযোগ্যভাবে।
সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যায়, শিল্পকলার বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুন নতুন এমন অনেক বিষয় উদ্ভাবন করেন যা ছিল মানুষের চিন্তার বাইরে। অথচ এক্ষেত্রে তারা চমত্কার রুচির পরিচয় দেন এবং ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে সযত্নে পরিহার করেন। এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে :
প্রথমত অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনায়াসেই মুসলমানরা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এ অবস্থায় মুসলমানদের যদি নিজস্ব কোনো শিল্প-সংস্কৃতি না থাকত, নবী করিম (সা.) যদি মুসলমানদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতিবোধকে উজ্জীবিত না করতেন, তাহলে সহজেই তারা অমুসলমানদের সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। প্রত্যেকেই মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা করত। মুসলমানদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরত নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ফলে মুসলমানদের কখনো অন্যেরটা গ্রহণ করতে হতো না। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা তাদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলে এবং তারা এটা করে থাকে বিজ্ঞানের বিকাশ তথা মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে।
অনুবাদ : মুহাম্মদ লুত্ফুল হক
No comments:
Post a Comment