সূরা ইখলাসে আছে আল্লাহর একত্বের উদাত্ত ঘোষণা এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর স্মরণে গুণগান।
তেমনিভাবে কোরআনে আছে সূরা কাউসার। যেখানে আল্লাহ তার হাবিবে খোদা মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)কে যে মহান নেয়ামত দান করেছেন তার উচ্চকিত প্রশংসার বাণী
জিকির অর্থ স্মরণ। রাব্বুল আলামিন দুনিয়াতে মানব ও জিন জাতিকে বানিয়েছেন তাঁর বন্দেগি অর্থাৎ জিকিরের জন্য। আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতকে নফসে আম্মারা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
জিকিরের মাধ্যমে সাধারণ নফস দোষত্রুটিমুক্ত হয়ে তাজকিয়ায়ে নফস অর্থাৎ পরিশুদ্ধি অর্জন করে। সাধারণ মানের নফসে আম্মারা থেকে পুণ্যাত্মা এবং নফসে মুতমায়িন্নার অধিকারী হতে জিকরে এলাহি আবশ্যক।
মানবতা জিকরে এলাহি বন্ধ করে দিলে রাব্বুল আলামিনের শান-মানের কোনো পরিবর্তন হবে না। জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর শান বৃদ্ধি পায় না। বরং এর ফলে জাকেরের কলব শুদ্ধ হয়। হাদিসে পাকে উল্লেখ আছে, ‘ইন্নাস সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ি ওয়াল মুনকার’।
অর্থাৎ নিশ্চয়ই সালাত মানবকে অশালীন ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। এ জন্য কালেমায়ে তাইয়্যেবা পাঠ করার পর মুসলমানের প্রথম কর্ম হল ফরজ জিকর সালাত আদায় করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘আকিমিসসলাতি লি জিকরি’। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে সালাত প্রতিষ্ঠা কর। আল্লাহর স্মরণ করার অর্থ হল, আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশগুলো সুষ্ঠুভাবে মেনে চলা।
আল্লাহ বলেছেন, ‘ওয়ামা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুজুহু ওয়ামা নাহাকুম আনহু ফানতাহু’ অর্থাৎ আমার নবী যা বলেন তা গ্রহণ কর আর যা বর্জন করতে বলেছেন তা বর্জন কর। ইরশাদ হয়েছে, ‘আলা বি জিকরিল্লাহি তাতমাইননাল কুলুব’।
অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে অন্তরে শান্তি লাভ হয়। ইসলাম কথার অর্থ আত্মসমর্পণ। এতে লাভ হয় শান্তি, তাই ওই ব্যক্তিই সত্য জাকের যার অন্তরে শান্তি আছে। আমি সালাত আদায় করলাম কিন্তু অন্তরে শান্তি পেলাম না। তার অর্থ সালাত ও জিকিরের প্রকৃত মর্ম আমার কলবে পৌঁছেনি।
কারণ আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আল্লাহ ও তার রাসূলের ইচ্ছার বিরুদ্ধ কাজের জন্য সালাত ও জিকরে এলাহির মাধ্যমে যে ইসলামের শান্তির বারতা কলবে পৌঁছার কথা, তা আমরা সালাত আদায় করার পরও অনুভব করতে পারছি না।
এ জন্য আল্লাহর জিকিরের মর্মার্থ আমাদের বুঝতে হবে। আমরা যত জিকির আদায় করি এ জিকিরের মূল হচ্ছে কোরআন। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইন্না নাহনু নাজ্জালনালজ জিকরা ওয়া ইন্না লাহু লা হাফিজুন’ অর্থাৎ এ জিকির (কোরআন) আমি তোমাদের জন্য নাজিল করেছি এবং তা হেফাজত করার দায়িত্ব আমি আল্লাহর। কোরআনের প্রতিটি আয়াতই আল্লাহর জিকিরের অন্তর্ভুক্ত।
আমরা যে ফরজ জিকির সালাত আদায় করি তা এ আয়াতে কোরআনের মাধ্যমেই প্রমাণিত। সূরা ইখলাসে আছে আল্লাহর একত্বের উদাত্ত ঘোষণা এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর স্মরণে গুণগান। তেমনিভাবে কোরআনে আছে সূরা কাউসার। যেখানে আল্লাহ তার হাবিবে খোদা মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)কে যে মহান নেয়ামত দান করেছেন তার উচ্চকিত প্রশংসা বাণী। এতে বোঝা যায় আল্লাহর মহান বন্ধু মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর প্রশংসা বাণীও যেহেতু কোরআনের অংশ তাই সেটিও পরোক্ষে জিকরে এলাহি। আবার দেখা যায়, পবিত্র কোরআনে আছে সৃষ্টির জন্য আশীষ বাণী।
কোরআনে সূরা লাহাবে দেখতে পাই আবু লাহাব যিনি কিনা সম্পর্কে রাসূল (সা.)-এর চাচা তার প্রতি অভিসম্পাত, তার কাঠবহনকারী স্ত্রীর প্রতি অভিসম্পাত বাণী। আমরা প্রতিনিয়ত তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করছি। কারণ তারা ছিলেন দুষমনে রাসূল (সা.)। কোরআনে সূরা কাহাফে উল্লেখ আছে আসহাবে কাহাফ অর্থাৎ গুহাবাসী অলি-আল্লাহদের কথা।
যারা তাওহিদের বাণীকে উজ্জ্বল রাখার জন্য জীবনের পরোয়া না করে খোদাদ্রোহী শাসকের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের পালিত কুকুর ওলি-আল্লাহদের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিয়োজিত ছিল। যে কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে গুহাবাসী ওলি-আল্লাহদের জান্নাতের সুখবর দেয়া হয়েছে। তাদের নিরাপত্তারক্ষী নাপাক কুকুরকে আল্লাহওয়ালাদের সহায়তা করার কারণে জান্নাতে অলিদের সাথী হওয়ার সুখবর দেয়া হয়েছে।
কোরআনে আছে আল্লাহওয়ালা মূসা নবী (আ.) এবং খোদাদ্রোহী ফেরআউনের কথা। আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে মূসা (আ.) ও তার সাথীরা প্রলয় থেকে কীভাবে রক্ষা পেয়েছেন। এবং আল্লাহও মূসা নবীর বিরোধিতা করার কারণে ফেরআউনের সদলবলে নীলনদে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার স্মরণীয় কাহিনী কোরআনে আছে।
আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আ.) ও খোদাদ্রোহী নমরুদের কথা কোরআনে আছে। আল্লাহ ইব্রাহিম নবীকে কীভাবে অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করলেন, তুচ্ছ মশা দিয়ে পরাক্রমশালী নমরুদকে কীভাবে ধ্বংস করলেন তার স্মরণের কথা আছে কোরআনে।
আল্লাহর খুব কাছের আযাযিল ফেরেশতাদের সর্দার পরবর্তীতে আল্লাহর এক মহান নবী সৃষ্টিকূলের আদি পিতা আদম (আ.) সফিউল্লাহকে যথাযথভাবে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সম্মান না করার কারণে চির অভিশপ্ত ইবলিশে পরিণত হওয়ার ঘোষণা আছে কোরআনে। সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে, ‘সুম্মুম বুকমুন উমইউন ফাহুম লা ইয়ারজিউন। খাতামাল্লাহু আলা কুলুবিহিম ওয়াআলা সামইহিম ওয়াআলা আবসারিহিম গিসাওয়াতুন ওয়ালাহুম আজাবুন আজিম। অর্থাৎ তাদের চোখে কানে মুখে সিলমোহর মেরে দেয়া হয়েছে। তাদের কলব চিরভ্রষ্ট, তাদের শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি রুদ্ধ, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন জাহান্নামের আজাব। এরাই তারা যারা জিকিরে এলাহি কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী আল্লাহকে স্মরণ করে না এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের সঙ্গী হয় না।
এ আলোচনা থেকে আমরা এটা বুঝতে পারি জিকিরে এলাহি অর্থ আল্লাহ, নবী-অলিরা ও আল্লাহওয়ালাদের যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা। খোদাদ্রোহী, নবীবিরোধী, ওলিবিরোধী ইবলিশ, আবু লাহাব, ফেরআউন, নমরুদ ইত্যাদি ব্যক্তিদের ধিক্কার জানাব। এ ধরনের স্মরণের মাধ্যমে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব সূরা আলে এমরান ১০৪ আয়াতের আল্লাহর নির্দেশনা, তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক হোক যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজে আদেশ দেবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে, এরাই তো সফলকাম। রাব্বুল আলামিন আমাদের সত্যিকার জিকিরে এলাহির মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম অর্থাৎ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কবুল করুন, আমিন।
No comments:
Post a Comment