রাসূল (স)- এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি মেধা ও যােগ্যতার দিক দিয়ে সকলের চেয়েও উন্নত ছিলেন। তিনি ছিলেন বীরত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা ও বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে অদ্বিতীয় ব্যক্তিসত্তা। নবী-রাসুলগণ মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার দিক-নির্দেশনা লাভ করে থাকেন। তাদের জ্ঞান ও চিন্তা-ভাবনা গােটা পৃথিবীর সকল ব্যক্তিত্বের উর্ধ্বে হয়ে থাকে। এরূপভাবে আমাদের নবী করীম (স) -এর জ্ঞানও সারা বিশ্ববাসীর মধ্যে সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ। আল্লামা মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আসসালিহী তার রচিত 'সুবুলুল হুদা" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যদি জ্ঞানের একশত অংশ ধারণা করা যায় তাহলে তার মধ্যে ৯৯ ভাগ আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে প্রদান করেছেন এবং এক অংশকে সারা পৃথিবীবাসীকে দিয়েছেন। (সুবুলুল হুদা, খ-৭, পৃ. ১১ মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালেহী) এ কথার আলােকে বিভিন্ন স্তরের মেধাবী লােকদের কার্যাবলি এবং সার্বিক হিসাব গ্রহণ করলে মানব ইতিহাসের জ্ঞান আহরণকারী কার্যাবলি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি উদঘাটন, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার ব্যাপারে অভিজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গির হিসাব গ্রহণ করে আজকের মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়। যেহেতু এ সব মানুষের জ্ঞানের পরিমাণ একশত ভাগের এক ভাগের চাইতেও কম তাহলে রাসূল (স)-এর জ্ঞানকে কীভাবে আন্দাজ করা যাবে যার একার জ্ঞানের ভাগ হলো ৯৯( নিরানব্বই)? খ্যাতনামা আলেম শাহ আল আযহারী (রহ) 'দ্বিয়াউন নবীতে উল্লেখ করেছেন, নবী করীম (স)-এর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এর চেয়ে বড় আর কোনাে প্রমাণের প্রয়ােজন নাই। কারণ, নবীদের সরদার স্বীয় বিজ্ঞতার দ্বারা সকল প্রকারের লোেকদের ইসলামের ছাঁচে এভাবে ঢেলে সাজিয়েছিলেন যে, তার মেজাজ ও ফিতরাত (প্রকৃতি) পরিবর্তন করে রেখে দেবেন। (দ্বিয়াউন নবী (স) খ-৫, পৃ. ২৭১ মুহাম্মদ করম শাহ, প্রকাশক দ্বিয়াউল কুরআন পাবলিকেশনস, লাহাের।) কাজীউল কুযাত (বিচারকদের বিচারক) কাজী ইয়াজ রহমাতুল্লাহ কিতাবুশ শিফা বি তারীফী হুকুমিল মুস্তফা’তে লিখেছেনএতে কোনাে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, হুজুর (স) সকল মানুষের চাইতে অধিক জ্ঞানী ও ধীশক্তিসম্পন্ন এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। দুনিয়ার কোনাে ব্যক্তির নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেননি। অতীতের কোনাে বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্টও ছিলেন না, কোনাে কিতাবও অধ্যয়ন করেননি। তারপর কীভাবে তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাগর প্রবাহিত করে ছাড়লেন । আহকামে শরিয়তকে কীভাবে আন্দাজে পেশ করলেন, কেনােইবা শােনার সাথে সাথে শ্রোতার মেজাজ তা না মেনে উপায় থাকল না। এসব বক্তব্যের ওপর দৃষ্টি দেয়ার পর একজন জ্ঞানবান ব্যক্তি অবশ্যই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, সর্বশেষ নবী জ্ঞান-বুদ্ধিতে সকলের চেয়ে অগ্রগণ্য এবং এ সিদ্ধান্তে | পেীছাবে যে, এ পন্থার মধ্যে কোনােরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। (কিতাবুশ শিফা বিতারীফী হুকুকিল মুস্তফা, খ-১২, পৃ. ১২৯, ১৩০, কাজী ইয়াজ আন্দালুসী)
সীরাতে ইবনে হিসাবে নবী করীম (স)-এর জীবনের একটি ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে যার মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, হুজুর (স) ওই অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেও অতুলনীয় চৌকস জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কাবা শরীফের নির্মাণ কাজে মক্কার কুরাইশগণ যখন প্রত্যেক গােত্র পৃথক পৃথক পাথর সংগ্রহ করতে শুরু করল এবং ইমারত তৈরি করতে মশগুল রইল, এবং এ বিল্ডিং রুকন পর্যন্ত পৌছাল, তখন প্রত্যেক গােত্র চাইলো যে তারা তা পূর্ণ করবে। এ বিষয়ে কথাবার্তা এমন পর্যায়ে গিয়ে পেীছল যে, যা হত্যাযজ্ঞঃ পর্যন্ত যাবে। প্রত্যেক গােত্র একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। বনু আব্দুদদার এক পেয়ালা রক্ত ভরে রাখলাে এবং তাদের সব সঙ্গীদের হাত এ রক্তে চুবিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো । রক্তের মধ্যে হাত ঢুকানাের অর্থ এই ছিল যে, আমরা জীবন দিব কিন্তু পিছু হটবে না। এ ধরনের উত্তেজনার মধ্যে চার-পাঁচ রাত অতিক্রম হলাে এবং কোনােভাবে এ বিষয়ের কোনাে সমাধান হলাে না। অবশেষে কুরাইশ সম্প্রদায়া মসজিদে হারামে সমবেত হয়ে পরামর্শ করতে থাকে কী করা যায়? কুরাইশদের সবচেয়ে বয়স্ক বুর্গ আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরা বিন আব্দুল্লাহ বিন ওমর বিন মাখযুম বললেন, হে কুরাইশগণ! তােমরা এক কাজ করােতোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পাওয়া দিয়ে প্রথমে মসজিদে আসবে তার ফায়সালা মেনে নাও। ইবনে সায়াদ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সকলে মিলেই সিদ্ধান্ত নেন; পরদিন যে ব্যক্তি প্রথমে আসবে আমরা তার ফায়সালা মেনে নিব । এ সময় হযরত মুহাম্মদ (স) সেখানে তাশরীফ রাখেন। সব লোক তাকে দেখে খুবই খুশি হন এবং বলতে থাকেন, অশাই ইনি আল-আমিন। তিনি যে ফয়সালা করবেন আমরা খুশি মনে তা মেনে নেবাে। যখন হুজুর (স) পৌছালেন তখন সবাই বললেন, আমরা আপনার ফায়সালা মেনে নিচ্ছি, আপনি ফায়সালা করে দিন। হুজুর (স) বর্ণনা করেন ; আমার নিকট এক খণ্ড কাপড় নিয়ে আসে। লােকেরা কাপড় নিয়ে আসলে রাসূল (স) নিজে কাপড়ের ওপর হাজরে আসওয়াদ রেখে ঘােষণা করেন, তােমরা সব লােক সব গােত্র থেকে এই কাপড় ধর এবং একে উঠিয়ে দেওয়ালের পাশে নাও। যখন সৰ গােত্রের লােকেরা এই কাপড় (যার মধ্যে হাজরে আসওয়াদ ছিল) নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত নিয়ে আসে তখন তিনি স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ওটাকে উঠিয়ে দেওয়ালে রেখে দেন। এভাবে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায় এবং এর ওপর ভবন হতে থাকে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, খ-১, পৃ.-১২৭, তৰাকাতে ইবন সাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-২২৫, তারীখে তাবারী, খ-১, পৃ.-৬৮) এভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই প্রজ্ঞা ও বীরত্ব যুদ্ধের ওপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ গোত্রগুলােকে রক্তপাত থেকে হিফাজত করল। এ ঘটনা থেকে একথা প্ৰশ পায়। যে, রাসূল (স)-কে সালিশ বানানাের সময় সবাই আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ তার প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির ওপরে সকলের পূর্ণ নির্ভরতা ছিল। তারা জানতেন যে, তিনি সবচেয়ে মেধাশক্তিসম্পন্ন। তিনি এমন কোনাে পন্থা অবশ্যই বের করবেন যার ওপর প্রতিটি গোত্র ঐকমত পােষণ করবে। নবী করীম (স)-এর জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পর্কে আল্লামা যাইনী দিহলান আসসীরাতুন নব্বীয়াহ'তে লিখেছেন- 'আল্লাহ তাআলা স্বীয় হাবীব নবী (স)-কে সব সৃষ্টির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিষয়ের ওপর সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যাতে মহানবী (স) অবস্থার সংশােধন করতে পারেন এবং উত্তম অবস্থাগুলাের দিকে লােকদেরকে দিকনির্দেশনা দানে সক্ষম হন। আল্লাহ তাআলা নবী করীম (স)-কে তার সকল বান্দার প্রতি প্রেরণ করেছিলেন, তিনি যাতে সকলকে আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান আনার জন্য দাওয়াত দিতে পারেন। আর এ কাজ যত সময় পর্যন্ত পরিপূর্ণ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিষয়াবলির সংশােধন না করেন এবং এ কথার পরিধি অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়াবলিজানার ওপর নির্ভর করে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী (স)-কে দূৱদৃষ্টিসম্পন্ন করে তৈরি করেছিলেন। হুজুর (স) সৃষ্টির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ সামষ্টিক অবস্থার বিশ্লেষণ করতেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন, যার মাধ্যমে তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থার দাবি পূর্ণ হত। (সীরাতে নাইয়াহ, খ-৩, পৃ. ২৩, আহমদ ইবনে যাইনী দিহান। দ্বিয়াউন নবী করীম (স) খ-৫, পৃ. -২৭২)। কাজীউল কুযাত আল্লামা কাজী ইয়াজ (র) রাসূল (স) -এর জ্ঞানগত মর্যাদা নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন
أن النبى صلى الله عليه وسلم أرجع التاس عقلا وافضلهم رابا .
অর্থ ও নিশ্চয়ই নবী করীম (স)-এর জ্ঞান ও প্রজ্জা সব লােকের চাইতে উত্তম ছিল। সব বিষয়ে হুজুর (স)-এর মত সকল লােকের থেকে উত্তম ছিল। (কিতাবুল শিফা বিতারীফি হুকুকিল মুস্তফা, খ-১, পৃ.-৮২ কাজী ইয়াজ আন্দালুসী।) ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রা) থেকে বর্ণিত, মানব সভ্যতার শুরু থেকে কিয়ামত হওয়া পর্যন্ত আহ্বাহ তাআলা সকল মানুষকে যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন, ঐ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নবী করীম (স)-এর মুকাবিলায় এতটুকু কণাও নয় দুনিয়ার সব মরুভূমির কণার তুলনায় যা হয়। (দ্বিয়াউন নবী (স) খ-৫, পৃ. ২৭৩, পীর মুহাম্মদ করম শাহ, দ্বিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স, লাহাের)
রাণী প্রাচ্যবিদও এ কথা স্বীকার করেছেন যে, রাসূল (স) জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে অত্যন্ত পরিপূর্ণ ছিলেন। তিনি লিখেছেন : রাসূলুল্লাহ (স) তিনি তাে সম্পূর্ণ নিৰক্ষৰ (যিনি কোনাে শিক্ষকের নিকট পড়েননি) ছিলেন, অথচ জান ও মতামতের দিক থেকে সকলের থেকে ধীশক্তিসম্পন্ন ছিলেন। (আরবের ইতিহাস শ, ১০৩, মসিয়ে সিদিভ, অনুবাদক মৌলভী আব্দুল হালীম আনসারী)। ইংরেজ ঐতিহাসিক থমাস কার্লাইল (Thornits Carlyte) মহানবী (স) সম্পর্কে (Her) ant Her Worship) গ্রন্থে লিখেছেন - একথা ঠিক যে, নবী (স) অনেক ধীশক্তিসম্পন্ন ছিলেন এবং রাসূল (স)-এর পর্যবেক্ষণ ছিল গভীর এবং স্মৃতিশক্তি ছিল প্রচণ্ড রকমের।' (অমুসলিমদের দৃষ্টিতে ইসলামের নবী, পৃ-৪১, মুহাম্মদ ইয়াহইয়া খান, জাহানজীব বুলক, অাল্লাম ইকবাল টাউন, লাহাের)। ইউরােপের প্রথিতযশা বিশ্লেষক কে, টি, লাওল -এর বক্তব্য হলাে- মুহাম্মদ (স) একজন বড় রাষ্ট্রপতি, একজন বড় বিজয়ী, অনেক বড় জ্ঞানী ও বিত্তবান ব্যক্তি ছিলেন। নবী (স)-এর প্রতি অপবাদ মক্কার কাফিরগণ যখন প্রতিরােধের কোনাে সাধারণ ভাষা হারিয়ে ফেলে তখন তারা নবী (স) কে পাগল বলতে থাকে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে হাকীমে বর্ণনা করেছেন . ১ L-21 L অর্থঃ হে প্রিয় হাবীব! আপনি আপনার রবের করুণায় পাগল নন। (সূরা কালাম, আয়াত-২) কুরআন মাজীদের এ ধরনের প্রকাশ্য ঘােষণা সার্বক্ষণিক অস্বীকৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি পাগল নন; পাগল ছিলেন না এবং কখনাে পাগল হবেন না । হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদের গুরুত্ব দেয় (এর সম্মান রক্ষা। করে) সে পাগলামি এবং মাথা খারাপ হওয়া থেকে মুক্ত থাকবে এবং কোনাে। কোনাে বর্ণনায় এও রয়েছে যে, এর জ্ঞান কখনাে লােপ পাবে না (অর্থাৎ সে বােধহীন হবে না)। মাওয়াহিবুর রহমান, প্যার-২৯, পৃ.-২৮, সাইয়েদ আমির আলী মালহাবাদী)। কুরআন মাজীদকে শুধু গুরুত্ব দেয়ার কারণেই যদি এতােটা মর্যাদা লাভ করা যায়, তাহলে তার মর্যাদা কী হবে যার ওপর এ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে ?
No comments:
Post a Comment