নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক গঠন ও গুণাবলী সম্পর্কে
কতিপয় হাদীস হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) বলেন, আমার মামা হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালাহ (রাঃ) যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক গঠন ও গুণাবলী অত্যাধিক ও স্পষ্টরূপে বর্ণনা করিতেন। আমার একান্ত আগ্রহ হইল যে, তিনি উহা হইতে আমাকেও কিছু বর্ণনা করিয়া শুনান যাহাতে আমি উহা হৃদয়ে গাঁথিয়া উহার উপর আমল করিতে পারি। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের সময় হযরত হাসান (রাঃ)এর বয়স মাত্র সাত বৎসর ছিল
হায়াতুস সাহাবাহ (রাঃ) বিধায় তিনি তাঁহার শারীরিক গঠন ও গুণাবলী ভালরূপে স্মৃতিবদ্ধ করিতে পারিয়াছিলেন না।) সুতরাং আমি তাহাকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বগুণে গুণান্বিত অতি মহৎ ছিলেন এবং মানুষের দৃষ্টিতেও তিনি অত্যন্ত মর্যাদাশীল ছিলেন। তাঁহার চেহারা মুবারক পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় ঝলমল করিত। মাঝারি গড়ন বিশিষ্ট ব্যক্তি হইতে কিছুটা লম্বা আবার অতি লম্বা হইতে খাট ছিলেন।
মাথা মুবারক সুসঙ্গতভাবে বড় ছিল। কেশ মুবারক সামান্য কুঞ্চিত ছিল, মাথার চুলে অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনাআপনি সিথি হইয়া গেলে সেইভাবেই রাখিতেন, অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে সিথি তৈয়ার করিবার চেষ্টা করিতেন না। (অর্থাৎ চিরুনী ইত্যাদি না থাকিলে এরূপ করিতেন। আর চিরুনী থাকিলে ইচ্ছাকৃত সিথি তৈয়ার করিতেন।) কেশ মুবারক লম্বা হইলে কানের লতি অতিক্রম করিয়া যাইত। শরীর মুবারকের রঙ ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল আর ললাট ছিল প্রশস্ত। ভ্রুদ্বয় বক্র, সরু ও ঘন ছিল। উভয় ভ্রু পৃথক পৃথক ছিল, মাঝখানে সংযুক্ত ছিল না। দ্রুদ্বয়ের মাঝে একটি রগ ছিল যাহা রাগের সময় ফুলিয়া উঠিত।।
তাঁহার নাসিকা উচু ছিল যাহার উপর একপ্রকার নূর ও চমক ছিল। যে প্রথম দেখিত সে তাঁহাকে উচু নাকওয়ালা ধারণা করিত। কিন্তু গভীরভাবে দৃষ্টি করিলে বুঝিতে পারি যে, সৌন্দর্য ও চমকের দরুন উচু মনে হইতেছে আসলে উঁচু নয়। দাড়ি মুবারক ভরপুর ও ঘন ছিল। চোখের মণি ছিল অত্যন্ত কাল। তাঁহার গণ্ডদেশ সমতল ও হালকা ছিল এবং গোশত ঝুলন্ত ছিল না। তাঁহার মুখ সুসঙ্গতপূর্ণ প্রশস্ত ছিল (অর্থাৎ সংকীর্ণ ছিল না)। তাঁহার দাঁত মুবারক চিকন ও মসৃণ ছিল এবং সামনের দাঁতগুলির মাঝে কিছু কিছু ফাঁক ছিল। বুক হইতে নাভী পর্যন্ত চুলের একটি রেখা ছিল। | তাঁহার গ্রীবা মুবারক মূর্তির গ্রীবার ন্যায় সুন্দর ও সরু ছিল। উহার রঙ ছিল রূপার ন্যায় সুন্দর ও স্বচ্ছ। তাঁহার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মাংসল ছিল। আর শরীর ছিল সুঠাম। তাঁহার পেট ও বুক ছিল সমতল এবং বুক ছিল প্রশস্ত। উভয় কাঁধের মাঝখানে বেশ ব্যবধান। ছিল। গ্রন্থির হাড়সমূহ শক্ত ও বড় ছিল (যাহা শক্তি সামর্থ্যের একটি প্রমাণ)। শরীরের যে অংশে কাপড় থাকিত না তাহা উজ্জ্বল দেখাইত ; কাপড়ে আবৃত অংশের ত কথাই নাই। বুক হইতে নাভী পর্যন্ত চুলের সরু রেখা ছিল। ইহা ব্যতীত বুকের উভয় অংশ ও পেট কেশমুক্ত ছিল। তবে উভয় বাহু, কাঁধ ও বুকের উপরিভাগে চুল ছিল। তাঁহার হাতের কবজি দীর্ঘ এবং হাতের তালু প্রশস্ত ছিল।
| শরীরের হাড়গুলি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সোজা ছিল। হাতের তালু ও উভয় পা কোমল ও মাংসল ছিল। হাত পায়ের অঙ্গুলিগুলি পরিমিত লম্বা ছিল। পায়ের তালু কিছুটা গভীর এবং কদম মুবারক এরূপ সমতল ছিল যে, পরিচ্ছন্নতা ও মসৃণতার দরুন পানি আটকাইয়া থাকিত না, সঙ্গে সঙ্গে গড়াইয়া পড়িত। তিনি যখন পথ চলিতেন তখন শক্তি সহকারে পা তুলিতেন এবং সামনের দিকে ঝুঁকিয়া চলিতেন, পা মাটির উপর সজোরে না পড়িয়া আস্তে পড়িত। তাঁহার চলার গতি ছিল দ্রুত এবং পদক্ষেপ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হইত ছোট ছোট কদমে চলিতেন না। চলার সময় মনে হইত যেন তিনি উচ্চভূমি হইতে নিম্নভূমিতে অবতরণ করিতেছেন। যখন কোন দিকে মুখ ঘুরাইতেন তখন সম্পূর্ণ শরীরসহ ঘুরাইতেন। তাঁহার দৃষ্টি নত থাকিত এবং আকাশ অপেক্ষা মাটির দিকে অধিক নিবদ্ধ থাকিত। সাধারণত চোখের এক পার্শ্ব দিয়া তাকাইতেন। অর্থাৎ লজ্জা ও শরমের দরুন কাহারো প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি খুলিয়া তাকাইতে পারিতেন না।) চলিবার সময় তিনি সাহাবীগণকে সামনে রাখিয়া নিজে পিছনে থাকিতেন। কাহারো সহিত সাক্ষাৎ হইলে তিনি অগ্রে সালাম করিতেন।
হযরত হাসান (রাঃ) বলেন, আমি আমার মামাকে বলিলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথাবার্তা কিরূপ ছিল, তাহা আমাকে শুনান। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম সর্বদা আখেরাতের চিন্তায় মশগুল থাকিতেন। সর্বক্ষণ (উম্মাতের কল্যাণের কথা) ভাবিতেন। দুনিয়াবী জিনিসের মধ্যে তিনি কোন প্রকার শান্তি ও স্বস্তি পাইতেন না। বিনা প্রয়োজনে কোন কথা বলিতেন না, অধিকাংশ সময় চুপ থাকিতেন। তিনি আদ্যপান্ত মুখ ভরিয়া কথা বলিতেন। (জিহ্বার কোণ দিয়া চাপা ভাষায় কথা বলিতেন
যে, অর্ধেক উচ্চারিত হইবে আর অর্ধেক মুখের ভিতর থাকিয়া যাইবে ; যেমন আজকাল অহংকারীরা করিয়া থাকে।)
তিনি এমন সারগর্ভ ভাষায় কথা বলিতেন, যাহাতে শব্দ কম কিন্তু অর্থ বেশী থাকিত। তাঁহার কথা একটি অপরটি হইতে পৃথক হইত। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কথা বলিতেন না, আবার প্রয়োজন অপেক্ষা এরূপ কমও না যে, উদ্দেশ্যই পরিষ্কার বুঝা যায় না। তিনি নরম মেজাজী ছিলেন, কঠোর মেজাজী ছিলেন না এবং কাহাকেও হেয় করিতেন না। আল্লাহর নেয়ামত যত সামান্যই হোক না কেন তিনি উহাকে বড় মনে করিতেন। না উহার নিন্দা করিতেন আর মাত্রারিক্ত প্রশংসা করিতেন। (নিন্দা না করার কারণ ত পরিষ্কার, যেহেতু আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত। আর অতিরিক্ত প্রশংসা না করার কারণ হইল এই যে, ইহাতে লোভ হইতেছে বলিয়া সন্দেহ হইতে পারে।) দ্বীনি বিষয় ও হকের উপর হস্তক্ষেপ করা হইলে তাঁহার গোস্বার সামনে কেহ টিকিতে পারিত না, যতক্ষণ না তিনি উহার প্রতিকার করিতেন (তাঁহার গোস্বা ঠাণ্ডা হইত না)।
অপর রেওয়ায়াতে আছে, তিনি দুনিয়া বা, দুনিয়ার কোন বিষয়ে রাগান্বিত হইতেন না। (কারণ তাহার দৃষ্টিতে দুনিয়া ও দুনিয়াবী বিষয়ের কোন গুরুত্ব ছিল না।) তবে দ্বীনি বিষয় বা হকের উপর কেহ হস্তক্ষেপ করিলে (গােস্বার দরুন তাঁহার চেহারা এরূপ পরিবর্তন হইয়া যাইত যে,) তাঁহাকে কেহ চিনিতে পারিত না এবং তাঁহার গােস্বার সামনে কিছুই টিকিত না, আর কেহ উহা রােধও করিতে পারিত না, যে পর্যন্ত তিনি উহার প্রতিকার না করিতেন। তিনি নিজের জন্য কখনও কাহারও প্রতি
No comments:
Post a Comment