বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন : সুষ্ঠুভাবে
বিচারকাজ পরিচালনা
করার জন্য
বিচারককে অবশ্যই
কিছু নীতিমালা
অনুসরণ করা
প্রয়োজন। যার
জ্বলন্ত উদাহরণ
মানুষের সামনে
রাসূল (সা.)
পেশ করে
গেছেন। সর্বপ্রকার
স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে
থেকে তিনি
সুস্থ মস্তিস্কে
বিচারকাজ পরিচালনা
করতেন, যেন
কারো প্রতি
অবিচার না
হয়ে যায়।
হাদিস শরিফে এসেছে- হজরত আবু বকর (রা.) বলেন,‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন : রাগান্বিত অবস্থায় যেন কোনো বিচারক দু’জন বিবদমানের মধ্যে বিচার ফায়সালা না করেন’ (বুখারি, মুসলিম)।
ন্যায় ও
ইনসাফের ভিত্তিতে
বিচারকাজ পরিচালনা
না করা
সম্পর্কে নবী
করিম (সা.)
কঠোর বাণী
উচ্চারণ করেছেন।
হজরত আবদুল্লাহ
ইবনে আবু
আউফা (রা.)
বলেন, রাসূল
(সা.) বলেছেন,
আল্লাহ তায়ালা
একজন বিচারকের
সাথে ততক্ষণ
পর্যন্ত থাকেন
যতক্ষণ একজন
বিচারক বিচারকাজে
জুলুম-অত্যাচারের
উর্ধ্বে থাকেন।
আর যখন
তিনি মানুষের
উপর জুলুম
ও বেইনসাফি
করেন তখনই
আল্লাহতায়ালা ঐ
বিচারকের নিকট
থেকে পৃথক
হয়ে যান
এবং শয়তান
এসে তার
সাথী হয়ে
যায়’ (তিরমিজি,
ইবনে মাজা)।
হজরত আয়েশা
(রা.) রাসূলুল্লাহ
(সা.) হতে
বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন,
ন্যায়বিচারক কাজী
কিয়ামতের দিন
এই আকাংখা
করবেন যে,
দুই ব্যক্তির
মধ্যে সামান্য
খেজুরের ফায়সালাও
যদি তাকে
পৃথিবীতে না
করতে হতো,
তবে কতই
না ভালো
হতো (মুসনাদে
আহমদ)।
ইতিহাস সাক্ষী
রাসূল (সা.)
সমাজের প্রতিটি
ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার
সংরক্ষণে এক
আপোষহীন যোদ্ধা
ছিলেন।
ন্যায়বিচারের তিনি যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার জল্বন্ত প্রমাণ হচ্ছে- একদিন এক ইহুদি রাসূল (সা.) এর কাছে একজন সাহাবীর বিরুদ্ধে নালিশ করলেন এবং বিচার প্রার্থনা করলেন। রাসূল (সা.) সাহাবীর পক্ষে রায় না দিয়ে ইহুদির পক্ষে রায় দিলেন
আজকে
যারা সাম্প্রদায়িকতার জুজুর ভয়
দেখিয়ে মুসলমানদের
উপর একতরফাভাবে
সব দোষ
চাপিয়ে দেন
তারা যদি
ইসলামের নবী
হযরত মুহাম্মদ
(সা.) এর
বিচার ফায়সালা
নিয়ে গবেষণা
করতেন তাহলে
বিচারের বাণী
নিভৃতে কাঁদতো
না। একথা
আমাদের ভুলে
গেলে চলবে
না যে,
দুনিয়ার বিচারপতির
উপর আরেকজন
বিচারপতি আছেন।
সেই বিচারপতির
সামনে একদিন
সকল বিচারপতিকে
দাঁড়াতে হবে
এ বিশ্বাস
যারা পোষণ
করেন তাদের
উচিত রাসূলুল্লাহ
[সা]এর
বিচার ব্যবস্থার
দিকে দৃষ্টি
দেয়া।
রাসূল (সা.)
বলেন, “যে
ব্যক্তি অমুসলিম
নাগরিকের উপর
অত্যাচার করবে,
অথবা তার
অধিকার হরণ
করবে অথবা
তার সম্মতি
ব্যতীত জোরপূর্বক
কোন জিনিস
ছিনিয়ে নিবে,
আমি কিয়ামতের
দিন আল্লাহর
আদালতে অমুসলিমের
পক্ষে উকিল
হয়ে দাঁড়াবো।”
পৃথিবীর সূচনালগ্ন
থেকে শুরু
আজ পর্যন্ত
নিজ ধর্মের
বাহিরে অন্যধর্মের
অধিকারের কথা
বলেছেন এমন
নেতা খুঁজে
পাওয়া দুষ্কর।
আর এ
কারণে হযরত
মুহাম্মদ (সা.)
চিরশত্রুরাও তাকে
আল-আমীন
বলে ডাকতো।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আজ আইনের
বাণী নিভৃতে
কাঁদে। এই
অশান্ত পৃথিবীর
ন্যায়বিচারের দায়িত্বে
যারাই নিয়োজিত
রয়েছেন তারা
যদি মুহাম্মদ
(সা.) এর
ন্যায়বিচার থেকে
শিক্ষা নিতে
পারতেন তাহলে
বিচারালয়ে অবিচার
হতো না।
মহান আরশের
অধিপতি আমাদের
শাসক ও
বিচারকার্য যারা
পরিচালনা করেন
তাদের সবাইকে
রাসূলুল্লাহ [সা]
এর দেখানো
পথে বিচার
ফায়সালা করার
তাওফিক দিন।
হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রা.) ন্যায়বিচার ০২
মুসলিম জাহানের
প্রথম খলিফা
হযরত আবু
বকর সিদ্দিক
(রা.) ৫৭৩
খ্রিষ্টাব্দে মক্কার
কুরাইশ বংশে
জন্মগ্রহণ করেন।
নবীদের পর
সাহাবায়ে কেরামের
মর্যাদা সর্বাধিক।
সাহাবীদের মধ্যে
হযরত আবু
বকর সিদ্দিক
(রা.) অন্যতম
ছিলেন। উনার
বাল্য নাম
আবদুল্লাহ ও
ডাকনাম আবু
বকর। সিদ্দিক
হচ্ছে তাঁর
উপাধি। আমরা
অনেক জানি
যে মিরাজের
ঘটনাকে সর্বপ্রথম
মনেপ্রাণে তিনি
বিশ্বাস করেছিলেন
বলেই বিশ্বনবী
হযরত মুহাম্মদ
(সা.) তাঁকে
এই উপাধিতে
ভূষিত করেন।
পিতার
নাম উসমান,কুনিয়াত আবু কুহাফা। মাতার নাম
সালমা এবং
কুনিয়াত উম্মুল
খায়ের। কুরাইশ
বংশের উপর
দিকে ষষ্ঠ
পুরুষ মুররা
তে গিয়ে
রাসূলুল্লাহ (সা.)
নসবের সাথে
তাঁর নসব
মিলিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহর জন্মের
দুবছরের কিছু
বেশী সময়
পর তিনি
জন্ম গ্রহণ
করেন এবং
অনুরূপ সময়ের
ব্যবধানে তাঁরা
উভয়ে ইনতিকাল
করেন। তাই
মৃত্যুকালে তাঁর
বয়স হয়েছিল
রাসূলুল্লাহ (সা.)
বয়সের সমান।
সত্য ও
ন্যায়ের পতাকে
উড্ডীন করার
জন্য আবু
বকর (রা.)
এর ত্যাগের
ঘটনা লিখলে
সমাপ্তি টানা
যাবে না।
তার জ্ঞান,মেধা ও
বুদ্ধির জন্য
সবাই তাকে
শ্রদ্ধা করত।
মানুষের দুঃখ,
কষ্ট দূরীভূত
করার জন্য
আত্মনিবেদিত ছিলেন।
তিনি সবসময়ই
আল্লাহ তায়ালার
রাসূল (সা.)কে ছায়ার
মতো অনুসরণ
করতেন। হযরত
মুহাম্মদ (সা.)
এরশাদ করেন,
আমার উম্মতের
মাঝে আবু
বকরণ বেশি
দয়ালু। নবী
করিম (সা.)
আরো বলেন,
বন্ধুত্ব ও
সাহায্য আবু
বকর আমাকে
বেশি করেছিলেন।
ইহজগতে যদি
আল্লাহ ছাড়া
অন্য কাউকে
বন্ধু হিসেবে
গ্রহণ করতাম
তাহলে আবু
বকরকেই করতাম।
তিনি আরো
বলেন- দুনিয়ায়
এমন কোনো
ব্যক্তির ওপর
সূর্যোদয় ও
সূর্যাস্ত হয়নি,
যে পয়গম্বরদের
পর হজরত
আবু বকর
থেকে উত্তম
ও শ্রেষ্ঠ।
তাঁর চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্য, মাধুর্য
ব্যবহার, ব্যক্তিত্বের
বলিষ্ঠতা, অগাধ
জ্ঞানের গভীরতা,
অধিকার বাস্তবায়নে
ত্যাগের মহিমা
আর নিঃস্বার্থ
প্রজা পালনে
সমগ্র বিশ্বব্যাপী
হযরত আবু
বকর সিদ্দিক
(রা.) রাষ্ট্রপরিচালনায় যে উদারতা
দেখিয়ে গেছেন
তা ইতিহাসের
পাতায় কিয়ামত
পর্যন্ত লিপিবদ্ধ
থাকবে।
হযরত আবু
বকর (রা.)
শাসনামল পর্যন্ত
বিচারব্যবস্থা অনেকটা
সে রূপরেখার
ওপরই চলতে
থাকে যেমনটা
রাসূল (সা.)
এর আমলে
ছিল। ইমাম
বাগাভী রহ.
ইবনে মেহরানের
রেওয়ায়াত মোতাবেক
হযরত আবু
বকর (রা.)
এর বিচারপদ্ধতি
সর্ম্পকে বর্ণনা
করেন, হযরত
আবু বকর
(রা.) এর
কাছে যখন
বাদী বিবাদী
আসত তখন
তিনি প্রথমে
কুরআনে কারীমের
দিকে মনোনিবেশ
করতেন। তাতে
হুকুম পেয়ে
গেলে সে
মোতাবেক বিচার
ফায়সালা করে
দিতেন। যদি
সেখানে কোনো
হুকুম না
পাওয়া যেত,
তাহলে তিনি
সরাসরি নিজে
নবী করীম
(সা.) এর
কোনো ফায়সালা
কিংবা কোনো
কর্ম অথবা
বক্তব্য জেনে
থাকতেন, তাহলে
সেটাকে বিচার
ফায়সালার ভিত্তি
হিসেবে গ্রহণ
করতেন। আর
যখন তাও
না থাকত
তখন বিশেষ
বিশেষ দায়িত্বশীল
সাহাবায়ে কেরামকে
জিজ্ঞেস করতেন,
তোমাদের কারও
এ মামলা
সম্পর্কে রাসূলে
কারীম (সা.)
থেকে কোনো
কিছু জানা
থাকলে বলো।
এ অবস্থায়
কখনও তারা
একমত হয়ে
বলতেন, হুযুর
(সা.) এ
ব্যাপারে একথা
বলেছেন। তখন
তিনি শুকরিয়া
জ্ঞাপন করে
বলতেন, আল্লাহর
অশেষ শুকরিয়া,আমাদের মাঝে
এমন লোকও
বিদ্যমান রয়েছেন
যারা নিজেদের
নবীর কথা
সংরক্ষিত রেখেছেন।
যদি চেষ্টা
প্রয়াসের পরেও
নির্ধারিত প্রসঙ্গে
হুযুর (সা.)
এর কোনো
ফায়সালা জানতে
না পারতেন
তখন জ্যেষ্ঠ
সাহাবায়ে কেরামকে
সমবেত করে
তাদের সামনে
মামলাটি উপস্থাপন
করতেন এবং
ঐক্যমতের ভিত্তিতে
বিচার ফায়সালা
করতেন।
বর্তমান বিশ্বে
আবু বকর
(রা.) মতো
ন্যায়বিচারক রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা বিচারক
খুঁজে পাওয়া
যাবে না।
আবু বকর
(রা.) এর
শাসনামলে হযরত
উমর (রা.)
প্রধান বিচারপতির
দায়িত্বে নিয়োজিত
ছিলেন। প্রত্যেকটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে
হযরত উমর
(রা.) সিদ্ধান্ত
প্রদান করতেন।
হযরত উমর
(রা.) এতটাই
স্বাধীনভাবে বিচারকার্য
পরিচালনা করতেন
যে, মনে
হতো উমর
(রা.)ই
রাষ্ট্রের খলিফা।
এমনকি আবু
বকর (রা.)
মতের কোন
গুরুত্ব দিতেন
না। একদিন
আকরা’ইবন
হাবিস ও
উয়াইনা ইবন
হিছন আল-ফাযারী আবু
বকর (রা.)
এর খেদমতে
হাজির হয়ে
একটি পতিত
জমি তাঁদেরকে
প্রদান করার
জন্যে আবেদন
করেন। খলিফা
তাঁদের আবেদনের
প্রেক্ষিতে উক্ত
জমিটি তাঁদের
নামে লিখে
দেন। তখন
তাঁরা খলিফার নির্দেশ
সত্যায়িত করার
জন্য হযরত
উমর (রা.)
নিকট আসেন।
কিন্তু উমর
(রা.) অত্যন্ত
রাগান্বিত হয়ে
নির্দেশটি তাঁদের
হাত থেকে
নিয়ে ছিঁড়ে
ফেলেন এবং
বলেন রাসূলুল্লাহ
(সা.) সেই
যুগে তোমাদের
সন্তুষ্টির জন্য
এরূপ করতেন
যখন ইসলাম
খুব দুর্বল
ছিল। এখন
ইসলাম অনেক
শক্তিশালী হয়েছে,
অতএব তোমাদের
যা খুশি
করতে পারো।
তখন উভয়ে
সেখান থেকে
প্রস্থান করে
সোজা আবু
বকর (রা.)
এর নিকট
গেলেন এবং
বললেন, খলিফা
কে আপনি
নাকি উমর?
আবু বকর
(রা.) বলেন
খলিফা উমর
(রা.) হতেন
যদি তিনি
ইচ্ছে করতেন।
ইতিমধ্যে হযরত
উমর (রা.)
ক্রোধান্বিত হয়ে
সেখানে পৌঁছেন
এবং আবু
বকর (রা.)
এর কাছে
যুক্তি দেখিয়ে
বলেন, আপনি
কিভাবে এদেরকে
এ জমি
দান করলেন?
এটার মালিক
কি আপনি
না সমগ্র
মুসলিম? আবু
বকর (রা.)
বললেন সমগ্র
মুসলিম। তখন
উমর (রা.)
বললেন, তাহলে
কিভাবে আপনি
এ দুজনকে
তা দান
করলেন? আবু
বকর (রা.)
বললেন এই
সময় যাঁরা
আমার নিকট
উপস্থিত ছিলেন
তাঁদের সাথে
পরামর্শ করেছি।
অবশেষে আবু
বকর (রা.)
নিজের সিদ্ধান্তকে
প্রত্যাহার করে
নিলেন এবং
হযরত উমর
(রা.) এর
সিদ্ধান্তটিকে বহাল
রাখিলেন।
আবু বকর
(রা.) এর
সাধারণ নিয়ম
ছিল যে,
ব্যক্তিগত পর্যায়ে
যদি কোনো
অপরাধ সংঘটিত
হতো তাহলে
তিনি তা
উপেক্ষা করে
যেতেন। আবূ
বারযাহ (রা.)
বলেন, একবার
আবু বকর
(রা.) এর
খিলাফতের সময়
এক ব্যক্তি
মুখের ওপর
তাঁকে খুবই
শক্ত কথা
বললো। তখন
আবু বকর
(রা.) তার
ওপর অত্যন্ত
রাগান্বিত হন।
এক ব্যক্তি
তখন বললেন
হে আল্লাহর
রাসূল (সা.)
এর খলিফা,
আপনি আমাকে
নির্দেশ প্রদান
করুন, আমি
তার গর্দান
উড়িয়ে দিই।
এটা শুনে
আবু বকর
(রা.) এর
রাগ হ্রাস
পায় এবং
তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন,
যদি আমি
তোমাকে নির্দেশ
দিতাম তাহলে
কি সত্যিই
তুমি তার
গর্দান উড়িয়ে
দিতে? অতঃপর
বললেন’ ধিক
তোমাকে! আল্লাহর
কসম, একমাত্র
রাসূলুল্লাহ (সা.)
এর সাথে
অভদ্র আচরণকারী
ব্যক্তি ছাড়া
কারো সাথে
এরূপ আচরণ
করা যাবে
না অর্থাৎ
হত্যা করা
যাবে না।
আবু বকর
(রা.) খলিফা
নির্বাচিত হওয়ার
পর প্রায়
বিশ হাজারেরও
বেশি সংখ্যক
সাহাবীর উপস্থিতিতে
যে রাষ্ট্রনায়কসূলভ বক্তব্য দিয়েছিলেন
তা সকল
যুগের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এক
অমূল্য সম্পদ।
সে বক্তব্য
প্রমাণ করে
তিনি ন্যায়বিচার
বা নীতির
প্রশ্নে কত
আপোষহীন ছিলেন।
তিনি মসজিদের
মিম্বরে দাঁড়িয়ে
সমবেত মুহাজির
ও আনসারদের
উদ্দেশ্যে প্রদত্ত
এক সংক্ষিপ্ত
ভাষণে বলেন-
হে জনমন্ডলী
আমাকে আমার
ইচ্ছার বিরুদ্ধেই
খলিফা হিসেবে
নির্বাচিত করা
হয়েছে। আল্লাহর
কসম, আমি
চাচ্ছিলাম, আপনাদের
মধ্য থেকে
অন্য কেউ
এ দায়িত্ব
গ্রহণ করুক।
আমি স্মরণ
করিয়ে দিতে
চাই, আপনারা
যদি চান
আমার আচরণ
রাসূলুল্লাহ (সা.)
আচরণের মত
হোক, তাহলে
আমাকে সেই
পর্যায়ে পৌঁছার
ব্যাপারে অক্ষম
মনে করবেন।
তিনি ছিলেন
নবী। ভুলত্রুটি
থেকে ছিলেন
পবিত্র। তাঁর
মত আমার
কোনো বিশেষ
মর্যাদা নেই।
আমি একজন
সাধারণ মানুষ।
আপনাদের কোনো
একজন সাধারণ
ব্যক্তি থেকেও
উত্তম হওয়ার
দাবী আমি
করতে পারি
না। আপনারা
যদি দেখেন
আমি সঠিক
কাজ করছি
তাহলে আমাকে
সহায়তা করবেন।
যদি দেখেন
আমি বিপদগামী
হচ্ছি তাহলে
আমাকে সতর্ক
করে দেবেন।
মনে রাখবেন
সততা একটি
আমানত ও
মিথ্যা একটি
খেয়ানত। আল্লাহর
কসম! আপনাদের
মধ্যে সবচেয়ে
দুর্বল ব্যক্তি
আমার কাছে
সবচেয়ে সবল
বলে বিবেচিত
হবে,যতক্ষণ
না আমি
তার ন্যায্য
অধিকার তাকে
দিতে পারি।
আর আপনাদের
মধ্যে সবচেয়ে
শক্তিশালী ব্যক্তি
আমার কাছে
সবচেয়ে দুর্বল
বলে বিবেচিত
হবে যতক্ষণ
না অন্যের
অধিকার আমি
তার থেকে
ছিনিয়ে নিতে
পারি। তাঁর
সেই সংক্ষিপ্ত
প্রথম ভাষণটি
কিয়ামত পর্যন্ত
বিশ্বের সকল
রাষ্ট্রনায়কদের জন্য
অনুকরণীয় হয়ে
থাকবে।
হযরত আবু
বকর (রা.)
ইসলামের জন্য
নিজের সকল
সম্পদ ওয়াকফ
করে দেন।
বিলাল, খাব্বার,
আম্মার, আম্মারের
মা সুমাইয়্যা,
সুহাইব, আবু
ফুকাইছ দাস-দাসী আবু
বকর (রা.)
অর্থের বিনিময়ে
দাসত্বের শৃঙ্খল
থেকে মুক্তি
লাভ করেন।
আবু বকর
(রা.) দানশীলতা
সম্পর্কে রাসূল
(সা.) বলেছেন-আমি প্রতিটি
মানুষের ইহসান
পরিশোধ করেছি।
কিন্তু আবু
বকরের ইহসানসমূহ
এমন যে,তা পরিশোধ
করতে আমি
অক্ষম। তার
প্রতিদান আল্লাহ
দিবেন। তার
অর্থ আমার
উপকারে যেমন
এসেছে, অন্য
কারো অর্থ
তেমন আসেনি।হযরত
আবু বকর
(রা.) যদিও
মুসলমানদের খলিফা
ছিলেন। তবু
তাঁর জীবন
খুবই সাদামাটা
ছিল। খলিফা
হওয়া সত্ত্বেও
তিনি মদীনার
অলিগলিতে ঘুরে
ঘুরে দেশের
জনগণের অবস্থা
জানতেন এবং
তাদের ব্যক্তিগত
কাজও সময়
সময় নিজ
হাতে করে
দিতেন। হযরত
উমর (রা.)
বলেন, আমি
প্রতিদিন সকালে
এক বৃদ্ধার
বাড়ীতে তার
ঘরের কাজ
করে দিতাম।
প্রতিদিনের মতো
একদিন তার
বাড়ীতে গেলে
বৃদ্ধা বললেন
আজ আর
কোন কাজ
নেই। এক
নেককার লোক
তোমার আগেই
কাজগুলি করে
দিয়ে গেছে।
হযরত উমর
(রা.) খোজ
নিয়ে জানতে
পারেন সেই
নেককার লোকটি
হচ্ছে হযরত
আবু বকর
(রা.)।
খলিফা হওয়া
সত্বেও এভাবে
অসহায় গরীব
বৃদ্ধার কাজ
করে দিয়ে
যেতেন। ইতিহাস
সাক্ষী হযরত
আবু বকর
(রা.) মাত্র
আড়াই বছরের
মত খিলাফত
পরিচালনা করেন।
তবে তাঁর
এই সময়টুকু
ইসলামের ইতিহাসে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বলে বিবেচিত
হয়। খলিফা
নির্বাচিত হওয়ার
পরেও কাপড়ের
ব্যবসা করে
জীবিকা নির্বাহ
করতেন। খলীফা
নির্বাচিত হওয়ার
কদিন পরের
ঘটনা। নতুন
চাদরের একটি
বোঝা নিয়ে
খলীফা বাজারে
চলছেন বিক্রি
করার জন্য।
হযরত উমর
(রা.) সাথে
হঠাৎ পথে
দেখা হয়ে
গেল। তিনি
বললেন, কোথায়
চললেন। আবু
বকর (রা.)
বললেন বাজারে
যাচ্ছি। হযরত
উমর (রা.)
বুঝলেন যে,খলীফা হওয়ার
আগে হযরত
আবু বকর
কাপড়ের যে
ব্যবসা করতেন
তা এখনও
ছাড়েননি। হযরত
উমর (রা.)
বললেন ব্যবসায়
মগ্ন থাকলে
খিলাফতের কাজ
চলবে কেমন
করে? প্রতিউত্তরে
হযরত আবু
বকর মুসলিম
জাহানের প্রথম
খলীফা বললেন,ব্যবসা না
করলে পরিবার
পরিজনদের ভরণ
পোষণ করব
কি দিয়ে?
উত্তরে হযরত
উমর (রা.)
বললেন চলুন
আবু ওবায়দার
কাছে যাই।
তাঁকে রাসূল
(সা.) বায়তুল
মালের খাজাঞ্চী
নিযুক্ত করে
গেছেন।তিনি আপনার
জন্য একটিা
ভাতা নির্দিষ্ট
করে দেবেন।
এরপর উভয়ই
হযরত আবু
ওবায়দার কাছে
গেলেন। তিনি
একজন সাধারণ
জনগণের জন্য
যে পরিমাণ
ভাতা নির্ধারণ
করেছিলেন সে
পরিমাণ ভাতা
খলীফাতুল মুসলিমীন
হযরত আবু
বকর (রা.)
এর জন্য
নির্দিষ্ট করে
দিলেন। ভাতা
নির্দিষ্ট হবার
পর খলীফা
একথাটি জনসাধারণের
সম্মুখে প্রকাশ
করে মদীনার
সকল লোককে
বললেন- তোমরা
জান যে,
ব্যবসা দ্বারা
আমি জীবিকা
নির্বাহ করতাম।
এখন তোমাদের
খলীফা হবার
ফলে সারাটা
দিনই খিলাফতের
কাজে ব্যস্ত
থাকতে হয়,
ব্যবসা দেখাশুনা
করতে পারি
না। সে
জন্য বাইতুল
মাল থেকে
আমাকে ভাতা
নির্দিষ্ট করে
দেয়া হয়েছে।
হযরত আবু
বকর (রা.)
বেঁচে থাকার
প্রয়োজনে যেটুকু
ভাতা গ্রহণ
করতেন জনসাধারণের
কাছ থেকে
এইভাবে তা
তিনি মঞ্জুর
করিয়ে নিলেন।
মৃত্যুর সময়
উপস্থিত হলে
তিনি হযরত
আয়িশা (রা.)কে বললেন,
আমার মৃত্যুর
পর আমার
প্রয়োজনার্থে আনা
বাইতুল মালের
যাবতীয় জিনিস
আমার পরবর্তী
খলীফার নিকট
পাঠিয়ে দিও।
তাঁর মৃত্যুর
পর কেনো
টাকা পয়সাই
তাঁর কাছে
পাওয়া যায়নি।
মাত্র একটি
দুগ্ধবতী উট,
একটি পেয়ালা,
একটি চাদর
ও একটি
বিছানাই তাঁর
সম্পদ ছিল।
এই জিনিসগুলো
মৃত খলীফার
নির্দেশ মোতাবেক
খলীফা হযরত
উমর (রা.)
কাছে পাঠিয়ে
দেয়া হলো।
এসব দেখে
খলীফা উমর
(রা.) অশ্রুসজল
চোখে বললেন,
আল্লাহ আবু
বকরের উপর
রহম করুন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ন্যায় বিচার ০৩
হযরত ওমর
ইবনে খাত্তাব
(রা.) আমিরুল
মুমিনিন ১৩
হিজরি মোতাবেক
২৪ আগস্ট
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে
মুসলিম জাহানের
দ্বিতীয় খলিফার
দায়িত্বভার গ্রহণ
করেন। আমিরুল
মুমিনিন নির্বাচিত
হওয়ার পর
তিনি মহান
আরশের মালিকের
কাছে কায়মনোবাক্যে
প্রার্থনা করেন,
‘হে আল্লাহ!
আমি দুর্বল,
আমাকে শক্তি
দিন। হে
আল্লাহ! আমি
রূঢ় মেজাজের
অধিকারী, আমাকে
কোমলপ্রাণ বানিয়ে
দিন। হে
আল্লাহ! আমি
কৃপণ, আমাকে
দানশীল বানিয়ে
দিন। হযরত
উমর (রা.)
রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে ন্যায়-ইনসাফের
ভিত্তিতে পরিচালিত
করেছিলেন। যে
সমাজ বা
রাষ্ট্রে আইনের
শাসন নেই
বা থাকলেও
দুর্বল সে
রাষ্ট্র যতই
শক্তিশালী হোক
তা বেশিদিন
টিকে থাকে
না। অল্পদিনেই
তাসের ঘরের
মতো ভেস্তে
যায়। হযরত
উমর (রা.)
রাষ্ট্রের সব
দুর্নীতি আর
অন্যায় অবিচার
রুখতে প্রতিষ্ঠা
করেন আইনের
শাসন। গঠন
করেন পুলিশ
ও সেনাবাহিনী।
আদালত ও
জেলহাজত নির্মাণ
করেন। বাদী
বিবাদী ন্যায়বিচার
পায় কিনা
তা দেখার
জন্য তিনি
আদালতে উপস্থিত
হতেন। সুন্দর
আইন ব্যবস্থাপনার
কারনে দেশের
জনগণ কোনো
অন্যায় করার
সাহস পেত
না। আধুনিক
আইনের নিয়ম-নীতি হজরত
উমর (রা.)
এর গড়া
নিয়মেরই প্রতিচ্ছবি।
হযরত ওমর
(রা.) রাসূলুল্লাহ
(সা.) এর
জন্মের তের
বছর পর
জন্ম গ্রহণ
করেন। ইসলাম
ধর্মকে দুনিয়ার
বুক হতে
চিরতরে মুছে
ফেলার জন্য
যে ওমর
ছিলেন অগ্রগামী।
সেই ওমর
আল্লাহ রাসূলের
সান্নিধ্যে এসে
ইসলামের বীর
সেনানী হয়ে
গেলেন। হযরত
ওমর (রা.)
ইসলাম গ্রহণ
করার পর
হতে ইসলামের
প্রচার ও
মুসলমানদের সংখ্যা
দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি
পেতে লাগল।
হযরত ওমর
(রা.) এর
ইসলাম গ্রহণ
ছিল প্রকৃতপক্ষে
ইসলামের মহা
বিজয়ের প্রথম
ধাপ। হযরত
ওমর (রা.)
এর নেতৃত্বে
খানায় কা’বায় প্রকাশ্যে
নামায আদায়
করা হয়।
তিনিই সর্বপ্রথম
হিজরী সন
প্রবর্তন করেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের
বাস্তব ভিত্তি
তার আমলে
স্থাপিত হয়।
হযরত ওমর
(রা.) এর
ন্যায় বিচারের
ইতিহাস অনেকে
জানেন আবার
অনেকেরণ অজানা
রয়েছে। তিনি
শুধু একটি
বিরাট সাম্রাজ্য
জয় করেই
ক্ষান্ত হননি।
বরং তিনি
এক মজবুত
শাসনপদ্ধতি কায়েম
করে এর
ভিত্তিমূলও সুদৃঢ়
করেছিলেন। হযরত
ওমর ইবনুল
খাত্তাব (রা.)
এর ন্যায়
বিচার বিশ্ব
ইতিহাসে স্মরণীয়
দৃষ্টান্তে পরিণত
হয়েছে।
আইনের চোখে
সবাই সমান
তা হযরত
ওমর (রা.)
কথায় নয়,
কাজের মাধ্যমে
পরিণত করেছিলেন।
বিচারের ক্ষেত্রে
উঁচু আর
নীচু জাতের
কোনো ব্যবধান
করতেন না।
শাস্তি প্রদানে
কলিজার টুকরা
সন্তানকেও রেহাই
দেননি। মদপানের
শাস্তিস্বরূপ ৮০টি
বেত্রাঘাত করেন
ছেলেকে। বেত্রাঘাতের
ফলে ছেলে
অসুস্থ হয়ে
পড়ে এবং
কয়েক দিনের
মাথায় ইন্তেকাল
করে। বর্তমান
পৃথিবীতে সুবিচারের
এমন উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত কি
খুঁজে পাওয়া
যাবে?
হযরত ওমর
(রা.) এর
শাসন আমল,
একদিন দু’জন লোক
এক বালককে
টেনে ধরে
নিয়ে আসল
তাঁর দরবারে।
ওমর (রা.)
তাদের নিকট
জানতে চাইলেন
যে, ব্যাপার
কি? কেন
তোমরা তাকে
এভাবে টেনে
এনেছ? তারা
বলল এই
বালক আমাদের
পরম শ্রদ্ধেয়
পিতাকে হত্যা
করেছে।
হযরত ওমর
(রা.) বালকটিকে
বললেন, তুমি
কি সত্যিই
তাদের পিতাকে
হত্যা করেছ?
বালকটি বলল
হ্যাঁ আমি
হত্যা করেছি
তবে তা
ছিল দুর্ঘটনাবশত।
আমার উট
তাদের বাগানে
ঢুকে পড়েছিল
তা দেখে
তাদের পিতা
একটি পাথর
ছুড়ে মারল,
যা উটের
চোখে লাগে।
আমি দেখতে
পাই যে
উটটি খুবই
কষ্ট পাচ্ছিল।
যা দেখে
আমি রাগান্বিত
হই এবং
একটি পাথর
নিয়ে তার
দিকে মারি,
পাথরটি তার
মাথায় লাগে
এবং সে
মারা যায়।
হযরত উমর
(রা.) দুই
ভাইকে বললেন,
তোমরা কি
এ বালককে
ক্ষমা করবে?
প্রতিউত্তরে তারা
বলল, না
আমরা তার
মৃত্যুদন্ড কামনা
করছি। ওমর
(রা.) বালকটির
কাছে জানতে
চাইলেন, তোমার
কি কোনো
শেষ ইচ্ছা
আছে?
বালকটি বলল
আমার আব্বা
মারা যাওয়ার
সময় আমার
ছোট ভাইয়ের
জন্য কিছু
সম্পদ রেখে
যান, যা
আমি এক
জায়গাতে লুকিয়ে
রেখেছি। আমি
তিন দিন
সময় চাই,
যাতে আমি
সেই জিনিসগুলো
আমার ভাইকে
দিয়ে আসতে
পারি। আমার
কথা বিশ্বাস
করুন।
হযরত ওমর
(রা.) বলেন
আমি তোমাকে
বিশ্বাস করতে
পারি যদি
তুমি এক
জন জামিন
জোগাড় করতে
পার, যে
নিশ্চয়তা দেবে
যে তুমি
ফিরে আসবে?
বালকটি দরবারের
চারদিকে তাকাল
এত মানুষের
মধ্যে কেউই
তার জামিন
হল না।
সবাই নিচের
দিকে তাকিয়ে
রইল। (চলবে)
No comments:
Post a Comment