সিজদার পরীক্ষা দুনিয়া ও আখিরাতেঃ
শুধু পৃথিবী এবং পৃথিবীর ভেতরকার সকল কিছুই নয়; নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমস্ত জীব ও জড় বস্তুও আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মগ্ন-নিমগ্ন। প্রত্যেকেই সিজদায় অবনত হয় তাঁর সকাশে। কিন্তু মানুষ ও জিন ছাড়া কারো হিসাব হবে না এবং পরীক্ষাও হবে না। মানুষ ও জিন জাতির সিজদার এই পরীক্ষা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানেই হবে। একদল মানুষ দুনিয়ায় আল্লাহ তাআ'লাকে সিজদাহ করেন। নিয়মিত সিজদাহ করাকে তারা নিজেদের অভ্যাস এবং অত্যাবশ্যকীয় কাজের অন্তর্ভূক্ত করে নিয়ে থাকেন। পরকালে সিজদার পরীক্ষায়ও এরা সফল হবেন। উত্তীর্ণ হবেন। আল্লাহ তাআ'লার পদতলে সিজদাহ প্রদানের মাধ্যমে জয়যুক্ত হবেন। আল্লাহ তাআ'লার সান্নিধ্যে পৌঁছে পরম সুখে অনন্তকালের জান্নাতে বসবাস করবে। পক্ষান্তরে আরেক দল আল্লাহ তাআ'লাকে সিজদাহ করেন না। আল্লাহ তাআ'লার কাছে আত্মসমর্পণও করেন না। এদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআ'লা বলেন,
فَمَا لَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
অতএব তাদের কী হলো যে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। -সুরা আল ইনশিকাক, আয়াত : ২০
وَإِذَا قُرِئَ عَلَيْهِمُ الْقُرْآنُ لَا يَسْجُدُونَ
এবং যখন তাদের কাছে কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তারা সিজদা করে না। -সুরা আল ইনশিকাক, আয়াত : ২১
আল্লাহ তাআ'লাকে অস্বীকারকারী এই দল সিজদাহ না করার কারণে পরকালেও আল্লাহ তাআ'লার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না। তারা সিজদাহ করতে সক্ষম হবে না। ফলে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে,
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ
স্মরণ করো, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে এবং তাদের সিজদাহ করার জন্য আহবান করা হবে, কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না। -সুরা আল কলম, আয়াত : ৪২
خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ
وَهُمْ سَالِمُونَ
তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে, তারা লাঞ্ছনাগ্রস্ত হবে। অথচ যখন তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল, তখন তাদের সিজদা করতে আহ্বান জানানো হয়েছিল। -সুরা আল কলম, আয়াত : ৪৩
فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا
يَعْلَمُونَ
অতএব যারা এই কালামকে মিথ্যা বলে, তাদের আমার হাতে ছেড়ে দিন, আমি এমন ধীরে ধীরে তাদের ধরব যে, তারা জানতে পারবে না। -সুরা আল কলম, আয়াত : ৪৪
পার্থিব জীবনে যারা আল্লাহ তাআ'লাকে সিজদাহ দিতে অভ্যস্ত নন; অলসতা কিংবা কার্পণ্য করে যারা সিজদাহ দেয়া থেকে বিরত থাকেন, তারা যে পরকালে, হাশরের বিভীষিকাময় সেই দিনটিতেও আল্লাহ তাআ'লার সামনে সিজদায় অবনত হতে সক্ষম হবেন না, তারা আপ্রাণ চেষ্টার পরেও সিজদাহ করতে পারবেন না- এ বিষয়টির পক্ষে বর্ণিত উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে বুখারি শরিফে দীর্ঘ একটি হাদিস রয়েছে। সে হাদিসের অংশবিশেষ উল্লেখ করছি,
فَيَقُولُ أَنَا رَبُّكُمْ فَيَقُولُونَ أَنْتَ رَبُّنَا فَلاَ يُكَلِّمُهُ إِلاَّ
الأَنْبِيَاءُ فَيَقُولُ هَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ آيَةٌ تَعْرِفُونَهُ
فَيَقُولُونَ السَّاقُ فَيَكْشِفُ عَنْ سَاقِهِ فَيَسْجُدُ لَهُ كُلُّ مُؤْمِنٍ
وَيَبْقَى مَنْ كَانَ يَسْجُدُ لِلَّهِ رِيَاءً وَسُمْعَةً فَيَذْهَبُ كَيْمَا
يَسْجُدَ فَيَعُودُ ظَهْرُهُ طَبَقًا وَاحِدًا
কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ মানুষের উদ্দেশে বলবেন, আমি কি তোমাদের রব! সবাই বলবে, হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব। (সে সময়) নবীরা ছাড়া আর কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলবে না। আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কি কেউ তার কোনো চিহ্ন জানো? তারা বলবে, পায়ের নলার তাজাল্লি। সেই সময় পায়ের নলা খুলে দেওয়া হবে। তখন সকল ঈমানদার ব্যক্তি সিজদায় পড়ে যাবেন। তবে যারা দুনিয়ায় প্রদর্শনীর জন্য আল্লাহকে সিজদাহ করতো তারা সিজদাহ করতে সক্ষম হবে না। তারা সে সময় সিজদা করতে চাইলে তাদের মেরুদণ্ডের হাড় শক্ত হয়ে একটি তক্তার মতো হয়ে যাবে (তাই তারা সিজদাহ করতে পারবে না)। -সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৩৯
জাহান্নামের আগুন সিজদার স্থান স্পর্শ করবে নাঃ
বস্তুতঃ আদম সন্তান নিজেদের কৃত পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে। অতঃপর জাহান্নামের আগুন তার সর্বাঙ্গ ভক্ষণ করবে সিজদার স্থান ব্যতীত। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ এদের প্রতিও দয়া করবেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
আল্লাহ যখন জাহান্নামীদের কাউকে দয়া করতে চাইবেন, তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন ঐ লোকদের বের করার জন্য, যারা আল্লাহর ইবাদত করত। অনন্তর তাঁরা তাদেরকে বের করবেন। তাঁরা তাদেরকে সিজদার চিহ্নসমূহ দেখে চিনে নিবেন। আল্লাহ আগুনের উপর সিজদার চিহ্ন ভক্ষণ হারাম করে দিয়েছেন। এভাবে তাঁরা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। -সহিহ বুখারী হা/৮০৬; মুসলিম হা/১৮২; মিশকাত হা/৫৫৮১
সিজদাহ স্রষ্টার নৈকট্যলাভের শ্রেষ্ঠতম মাধ্যমঃ
আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত, বিশ্বনবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَحَدَّثَنَا هَارُونُ بْنُ مَعْرُوفٍ، وَعَمْرُو بْنُ سَوَّادٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا
عَبْدُ اللَّهِ بْنُ وَهْبٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ غَزِيَّةَ،
عَنْ سُمَىٍّ، مَوْلَى أَبِي بَكْرٍ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا صَالِحٍ، ذَكْوَانَ
يُحَدِّثُ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ
" أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ
فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ " .
বান্দা আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়, যখন সিজদারত থাকে। অতএব তোমরা তখন অধিক দোয়া করতে থাকো। -মুসলিম, হাদিস : ৪৮২
অত্র হাদিস হতে শিক্ষণীয় কিছু বিষয়-
১। এই হাদিসটির দ্বারা প্রমাণ হয় যে, সিজদাহ মহান আল্লাহর বড় ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত এমন একটি ইবাদত, যে এই ইবাদতটির মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তি মহান আল্লাহর নৈকট্য, করুণা এবং অনুগ্রহ লাভ করে।
২। মুসলিম ব্যক্তির জন্য এটা প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা মোতাবেক বৈধ কর্ম যে, সে নফল বা ফরজ নামাজের মধ্যে তার প্রতিপালক মহান আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করবে। তবে নামাজের মধ্যে সিজদার অবস্থায় দুআ করা সর্বোত্তম।
৩। মুসলিম ব্যক্তির জন্য এটি একটি উত্তম কাজ যে, সে পবিত্র কুরআন এবং নির্ভরযোগ্য হাদিসের মধ্যে যে সমস্ত দুআ উল্লিখিত হয়েছে, সেসব দুআ'র প্রতি যত্নবান হবে এবং সেই দুআ'গুলো মুখস্ত করবে। কেননা, সেগুলো তার জন্য, তার পরিবার-পরিজনের জন্য এবং তার সন্তানদের জন্য ইসলাম ধর্মের বিষয়ে এবং দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ লাভের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি উপকারী।
Sunday, June 19, 2022
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment