নামাজে প্রভুর সঙ্গে যে কথা বলে মুমিন
দুনিয়ায় চরম কষ্টের সময় যখন মানুষ কারো কাছে ঠাঁই পায় না তখনও মাওলা বান্দাকে রিজিক দেন। বিপদে বান্দাকে কল্পনাহীন রহমত বরকতে দুয়ার খুলে দেন। এ কারণেই নামাজ মুমিনের জন্য মেরাজ। নামাজে মুমিন খুঁজে পায় দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রশান্তি।
আমার বান্দা যখন বলে- الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘আলহামদুলিল্লাহহি রাব্বিল আলামিন’
তখন
আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। বান্দার মুখ থেকে
'আলহামদুলিল্লাহহি রাব্বিল আলামিন' প্রশংসার উচ্চারণ শুনে আল্লাহ এতটাই
খুশি হন এবং গর্বিত হন যে, তিনি তাঁর ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, আমার বান্দা
আমার প্রশংসা করেছে।
বান্দা যখন হৃদয় থেকে বলে- الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ 'আর রাহমানির রাহিম'
তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার গুণাগান গায়।
বান্দা যখন হৃদয় থেকে বলে- مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ 'মালিকি ইয়াওমিদ্দিন'
তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করছে।
তারপর বান্দা যখন অনুগতচিত্তে বলে- إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ
نَسْتَعِينُ 'ইয়্যাকা নাবুদু ও ইয়্যাকা নাসতাইন' অর্থাৎ আমরা একমাত্র
আপনারই ইবাদত করি, একমাত্র আপনার কাছেই সাহায্য চাই।
তখন আল্লাহ বলেন- এটা আমার আর আমার বান্দার সম্পর্ক, বান্দা (যখন) যা চাইবে তা-ই সে পাবে।
তারপর বান্দা মহান প্রভুর কাছে একান্ত দরদ মাখা কণ্ঠে দুনিয়ার সেরা জিনিসের আবেদন করেন। আর তাহলো-
اهدِنَــــا
الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ
المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ 'ইহদিনাস সিরাত্বাল মুসতাক্বিম,
সিরাত্বাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়া
লাদদ্বাল্লিন' অর্থাৎ (হে প্রভু!) আপনি আমাদের সরল-সহজ পথ দেখান। তাঁদের
পথ, যাঁদের প্রতি আপনি নেয়ামত দান করেছেন, যাঁরা অভিশপ্ত বা গজবপ্রাপ্ত নন,
আর পথহারা বা পথভ্রষ্ট নন।'
তখনও আল্লাহ বলেন- এটা শুধু আমার বান্দার জন্য, আমার বান্দা যা চাইবে তা-ই পাবে।' (মুসলিম)
মুমিন যত সুখ আর দুঃখেই থাক না কেন, যখনই মাওলাকে অনুগত চিত্তে হৃদয় নিংড়ানো কথাগুলো বলেন তখন বান্দার আজমত তথা শ্রেষ্ঠত্বে ঝড় ওঠে, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের ডেকে বান্দার কথাগুলো শুনান এবং বান্দার ডাকে সাড়া দেয়া ও প্রার্থনা কুবলের ঘোষণা দিতে থাকেন।
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর সঙ্গে বান্দার কথোপকোথন কতইনা সুন্দর। যা হৃদয়কে আন্দোলিত করে। হৃদয়ে ভালোবাসার ঢেউ ওঠে। যে বান্দাকে তিনি নিজ হাতে তাঁর ইবাদত ও প্রশংসা গুণগান গাওয়ার জন্যই তিনি সৃষ্টি করেছেন। বান্দাও নামাজে তার সঙ্গে মধুর আলাপনে মেতে ওঠে।
এ কারণেই কুরআনে পাকে মহান আল্লাহ বান্দাকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করেন-
‘তোমরা
আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। কিন্তু যারা আমার ইবাদত সম্বন্ধে
অহংকার করে, তারা নিশ্চয় লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা মোমেন
: আয়াত ৬০)
বান্দার কাছে চাওয়ার বা প্রার্থনা করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো নামাজ। আবার
নামাজের মধ্যে সেজদা হচ্ছে আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করার মাধ্যম।
বান্দা এ সেজদায়ও আল্লাহর গুণগান ও প্রশংসা করতে পারে। শুকরিয়া আদায় করতে
পারে। তাঁর কাছে হৃদয়ে সব আকুতি তুলে ধরতে পারে। কেননা আল্লাহ তাআলাই
বান্দাকে সব দিয়েছেন। আল্লাহ তা উল্লেখ করে বলেন-
‘আর যা কিছু
তোমরা তার কাছে চেয়েছ তিনি তোমাদের সব দিয়েছেন এবং যদি তোমরা আল্লাহর
নেয়ামতগুলো গণনা করতে চাও, তা হলে তোমরা সেগুলোর সংখ্যা নিরূপণ করতে পারবে
না।’ (সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৩৪)
আল্লাহ তাআলা বান্দার ডাকে সাড়া দেন। তার বিপদে হাতছানি দেন। তার কষ্টে
প্রশান্তি দান করেন। আল্লাহর দেয়া বিধান মতো জীবন গড়ার উপদেশ দেন। আল্লাহ
তাআলা বলেন-
‘অথবা কে উদ্বিগ্নচিত্ত ব্যক্তির দোয়া শোনেন যখন সে
তার কাছে দোয়া করে এবং তার কষ্ট দূর করে দেন এবং তোমাদের পৃথিবীর
উত্তরাধিকারী করে দেন? আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো উপাস্য আছে? তোমরা খুব
কমই উপদেশ গ্রহণ কর।’ (সুরা নামল : আয়াত-৬২)
সুতরাং বান্দার উচিত, মহান রবের উপদেশ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা।
জীবনের সবক্ষেত্রে তারই কাছে আশ্রয় চাওয়া, দোয়া করা। প্রিয় নবি
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে পাকেও তা ঘোষণা করেছেন-
-
হজরত নুমান ইবনে বসির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দোয়া হলো ইবাদতের উৎস।' এ কথা
বলে তিনি (কুরআনের এ আয়াত) তেলাওয়াত করেন-
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
অর্থাৎ 'তোমাদের প্রভু বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক (দোয়া কর), আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (দোয়া কবুল করব)।' (তিরমিজি)
- হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন- 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও, আমি তোমার অন্তরকে প্রচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য (অভাব) ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না। (তিরমিজি)
মানুষ সত্যিই অকৃতজ্ঞ। তারা কেবল বিপদে পড়লেই আল্লাহকে স্মরণ করে আর যখন বিপদ চলে যায় তখন আবার আল্লাহকে ভুলে যায়। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সুখ-দুঃখ সব সময়ই মহান আল্লাহকে স্মরণ করা। নামাজে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় আল্লাহর সঙ্গে কথা বলাই মুমিনের অন্যতম কাজ। তবে আল্লাহ বান্দাকে দান করবেন দুনিয়া ও পরকালের সেরা নেয়ামত।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নামাজে আল্লাহর সঙ্গে অনুগতচিত্তে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশংসা নিজেদের নিয়োজিত রাখার তাওফিক দান করুন। সুখে-দুঃখে সব সময় আল্লাহর গুণগান জারি রাখার তাওফিক দান করুন। আল্লাহর কাছে আবেদন-নিবেদন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
No comments:
Post a Comment