Monday, August 8, 2022

 বনী ইসরাঈলের এক লোক ছিলো আমলদার, আরেক লোক ছিলো পাপী। আমলদার লোকটি পাপী লোকটিকে বিভিন্ন সময় উপদেশ দিতো, তাকে পাপ কাজ পরিহার করতে বলতো। কুরআনের ভাষায় এই ধরণের কাজকে বলে- ‘নাহি আনিল মুনকার’ বা মন্দ কাজে নিষেধ করা।
.
যথারীতি আমলদার লোকটি একদিন পাপী লোককে উপদেশ দিচ্ছিলো। পাপী লোকটি ক্ষ্যেপে গেলো! সে বললো, “আমাকে আমার রবের উপর ছেড়ে দাও। তোমাকে আমার উপর পাহারাদার করে পাঠানো হয়েছে?” অর্থাৎ, তার আর ভালো কথা শুনতে ভালো লাগছে না। সে বলতে চাচ্ছে- ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’।
পাপী লোকটির এমন কথা শুনে আমলদার লোকটি উল্টো ক্ষ্যেপে গেলো। সে শুধু ক্ষ্যেপে গেলোই না, একটি জাজমেন্টাল কথা বললো। সে বললো, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না/ তোমাকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।”
.
এমন কথা তো আমরাও বলি, তাই না? কোনো পাপী লোককে দেখলে আমরাও তো কনক্লুশনে পৌঁছে যাই, এই লোকটি জান্নাতে যেতে পারবে না।
.
তো, ঐ দুই লোকের মৃত্যু হয়। আল্লাহর নিকট দুজন হাজির হয়। আল্লাহ আমলদার লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কাছে যা আছে, সেটার উপর আমি ক্ষমতাবান নাকি তুমি ক্ষমতাবান?” অর্থাৎ, তুমি যে বললে ঐ লোকটি জান্নাতে যাবে না, সেটা বলার তুমি কে? তোমার কাছে কি জান্নাত-জাহান্নামের ক্ষমতা? তোমাকে কি ঠিক করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে?
.
আল্লাহ পাপী লোকটিকে বললেন, “তুমি আমার রহমতের জান্নাতে প্রবেশ করো।” অন্যদিকে আমলদার লোকটির উদ্দেশ্যে আল্লাহ বললেন, “একে জাহান্নামে নিয়ে যাও।”
.
পুরো উল্টো হয়ে গেলো না? পাপী লোকটি জান্নাতে গেলো আর আমলদার লোকটি জাহান্নামে গেলো। পাপী লোকটির আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ছিলো। অথচ আমলদার লোকটি নিজের আমলের উপর এতো বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলো যে, আরেকজনও যে জান্নাতে যেতে পারে, সেটা সে সহ্য করছে না। তার অহংকার তাকে জাজমেন্টাল বানিয়েছে। পাপীকেও আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন, এটা যেনো সে সহ্য করতে পারছে না। কে জান্নাত-জাহান্নামে যাবে এটা নির্ধারণ করার ‘দায়িত্ব’ আল্লাহ কোনো মানুষকে দেননি, কিন্তু ঐ আমলদার লোকটি এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে আরেকজনের ব্যাপারে মন্তব্য করেছে। তার এমন অযাচিত মন্তব্যের পরিণামে সেই বরং জাহান্নামে যায়!
.
হাদীসটি বর্ণনা করে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন! সে (আমলদার লোকটি) এমন উক্তি করেছে, যার ফলে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে গেছে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০১]
.
কয়েকদিন নিয়মিত মসজিদে নামাজে যাবার সময় কোনো বেনামাজীকে দেখলে আমাদের মনেও ইবাদাত নিয়ে আত্ম-অহংকার চলে আসে। কয়েকদিন একটানা ফজরের নামাজে গিয়ে মসজিদে কতিপয় বান্দার মধ্যে আমিও একজন দেখে আমরাও ভাবি, এলাকার সবাই তো জাহান্নামে যাবে, আমি জান্নাতে যাবো। যেকোনো ভালো কাজ করার পর দেখা যায় আমরা সেটাকে একজন পাপীর সাথে তুলনা করে আত্ম-তৃপ্তিতে ভুগি। মনে মনে ‘কনফার্ম জান্নাতী’ ফিলিংস চলে আসে!
.
এমন আত্ম-তৃপ্তি আমাদের পতন ঢেকে আনতে পারে। সত্যিকারের আমলদার বান্দা নিজের ইবাদাত নিয়ে মুগ্ধতাবোধ করে না। কারণ, সে শঙ্কায় থাকে তার ইবাদাত কবুল হবে কি-না। তারচেয়েও বিপদজনক হলো যারা জাজমেন্টাল। যারা কথায়, আচরণে আরেকজনকে ‘জাহান্নামী’ প্রমাণে ব্যস্ত।
.
এক্ষেত্রে ডক্টর খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহিমাহুল্লাহ) স্যারের একটি কথা আমার খুব পছন্দের। তিনি বলতেন (কথাটি যতোটুকু মনে পড়ে এরকম),
.
“পৃথিবীর সবাইকে যদি আল্লাহ জান্নাতে প্রেরণ করেন, তাহলে আমার জন্য জান্নাতের জায়গার কমতি হবে না। আরেকজন যদি জান্নাতে যেতে চায়, তাহলে তাকে আমি বাধা দেবো কেনো?”

No comments:

Post a Comment